বিশ্বকাপের শুরুতেই স্পেনের মাঝমাঠে ছন্দপতন, দে লা ফুয়েন্তের রণকৌশল নিয়ে উঠছে প্রশ্ন!

স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে মাঝমাঠ নিছক কোনো পজিশন নয়, বরং একটি আস্ত দর্শন। জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেতসদের হাত ধরে যে তিকিতাকা সংস্কৃতির জন্ম হয়েছিল, তার উত্তরাধিকার বহন করছেন বর্তমান প্রজন্মের রদ্রি, পেদ্রি ও দানি ওলমোরা। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতেই সেই চেনা শক্তিশালি মাঝমাঠ এখন স্প্যানিশ শিবিরে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে স্পেনের বলের দখল থাকলেও খেলায় ছন্দের অভাব ছিল স্পষ্ট। পাসিংয়ে নিখুঁত হলেও আক্রমণভাগে সেই ধার দেখা যায়নি, যা নিয়ে ফুটবল মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ভুল পজিশন ও পেদ্রির কার্যকারিতা হ্রাস
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে রদ্রিকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এবং তাঁর পাশে ফাবিয়ান রুইসকে খেলান। অন্যদিকে দলের অন্যতম সেরা সৃজনশীল মিডফিল্ডার পেদ্রিকে খেলানো হয় আরও সামনে, ‘নম্বর টেন’ ভূমিকায়। এই রণকৌশলের কারণে পেদ্রিকে তাঁর স্বাভাবিক খেলার বাইরে গিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ক্রমাগত দৌড়াতে এবং প্রতিপক্ষের প্রেসিং সামলাতে হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ম্যাচে পেদ্রি দলের পক্ষে সর্বোচ্চ আটবার সরাসরি প্রেস করেছেন এবং প্রায় ১২.৩ কিলোমিটার পথ দৌড়েছেন। অথচ অতীতে দেখা গেছে, কিছুটা ডিপ পজিশন থেকে খেললেই পেদ্রি নিজের সেরাটা দিতে পারেন। ২০২১ সালের ইউরো কিংবা সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তুরস্কের বিরুদ্ধে বড় জয়েও পেদ্রিকে নিচে থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে। দে লা ফুয়েন্তের বর্তমান কৌশলে পেদ্রির এই অতিরিক্ত পরিশ্রম তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে আড়াল করছে বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা।
মাঝমাঠের নতুন সমীকরণ ও ওলমো ফ্যাক্টর
স্পেন শিবিরের অন্যতম বড় সংকট হলো দানি ওলমোর ফর্ম। দে লা ফুয়েন্তের অধীনে নম্বর টেন পজিশনে ওলমো বরাবরই অত্যন্ত সফল ও বিপজ্জনক। ইউরো ২০২৪-এ পেদ্রির চোটের পর ওলমো এই পজিশনে নেমেই গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। ছোট জায়গায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং গোল করার দক্ষতায় ওলমো এই ভূমিকার জন্য দারুণ কার্যকর। কিন্তু পেদ্রিকে ওপরে খেলানোর কারণে ওলমোর জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
পেদ্রিকে যদি তাঁর প্রিয় ডিপ পজিশনে ফিরিয়ে আনা হয়, তবে রদ্রি কিংবা ফাবিয়ান রুইসের মধ্যে যেকোনো একজনকে একাদশের বাইরে রাখতে হবে। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ফাবিয়ানের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক ছিল না। অপরদিকে ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রির ফর্ম নিয়ে সমালোচনা হলেও কোচ দে লা ফুয়েন্তে তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। কোচ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, রদ্রি নিজের সেরা ফর্মের অর্ধেক দিলেও তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও কূটনৈতিক সমাধান
এই জটিলতা কাটাতে কোচ দে লা ফুয়েন্তে একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে পারেন, যেখানে দানি ওলমোকে উইংয়ে সরিয়ে রদ্রি, ফাবিয়ান ও পেদ্রিকে একসঙ্গে খেলানো সম্ভব। তবে এটি কেবলই একটি সাময়িক সমাধান হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে স্পেনকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চারজন বিশ্বমানের মিডফিল্ডারকে একসঙ্গে খেলাতে গিয়ে যদি পেদ্রির কার্যকারিতা নষ্ট হয়, তবে তা দলের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বিশ্বকাপ জয়ের মঞ্চে কেবল সেরা খেলোয়াড় থাকাটাই যথেষ্ট নয়, তাঁদের সঠিক পজিশনে ব্যবহার করাই এখন দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।