গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ! নতুন ‘গুন্ডা দমন’ বিল নিয়ে আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি বিকাশরঞ্জনের

কলকাতা: বিধানসভায় পেশ হতে যাওয়া নতুন দুটি বিল নিয়ে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোস্যাল অ্যাকটিভিজ বিল, ২০২৬’-কে বিরোধীরা সরাসরি ‘কালা কানুন’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। বিল দুটি পাশ হলে সরকারের হাতে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করার একচ্ছত্র ক্ষমতা চলে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন আইনজ্ঞরা।
কেন বিল দুটিকে ‘কালা কানুন’ বলছেন বিরোধীরা?
- আদালতের দরজা বন্ধ: প্রস্তাবিত বিলের ১৫পি এবং ১৫আর ধারা অনুযায়ী, প্রশাসনের তৈরি ‘ক্লেমস কমিশন’ যদি কারও বিরুদ্ধে জরিমানা ধার্য করে, তবে তার বিরুদ্ধে দেশের কোনো সিভিল কোর্ট বা সাধারণ আদালতে আপিল করা যাবে না। অর্থাৎ, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমজনতার জন্য আইনি প্রতিকারের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
- বিচারের নামে স্বেচ্ছাচার: বিলের ১৫এম ধারা অনুযায়ী, কমিশন চাইলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও দ্বিগুণ ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ চাপাতে পারে। আবার ১৫এ ধারার আওতায় যেকোনও রাজনৈতিক আন্দোলন বা প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ‘দাঙ্গা’ বা ‘নাশকতা’র তকমা দিয়ে আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনা যাবে।
- সংজ্ঞার আড়ালে দমন: ‘গুন্ডা’ বা ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে সরকার পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে যেকোনো বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী বা আন্দোলনকারীকে নিশানা করতে পারবে। সমস্ত অপরাধকে জামিন অযোগ্য করা হয়েছে এবং বিনা বিচারে ১২ মাস পর্যন্ত প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনে রাখা যাবে।
- আইনজীবীর সাহায্য নিষিদ্ধ: ১০.৪ ধারা অনুযায়ী, ধৃত ব্যক্তি অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সামনে সাধারণত কোনো আইনজীবীর সাহায্য পাওয়ার অধিকার পাবেন না।
বিকাশরঞ্জনের হুঙ্কার:
বাম নেতা ও বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, “এই আইনগুলোর উদ্দেশ্য অপরাধ দমন নয়, বরং হকার বা বস্তিবাসী উচ্ছেদের মতো সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ওঠা গণআন্দোলনগুলোকে দমন করা। যেকোনো গণতান্ত্রিক মানুষের অধিকার রক্ষার স্বার্থে আমাদের আদালতে লড়াই করতেই হবে।” তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিলটি পাস হলেও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তা চ্যালেঞ্জ করা হবে।
সরকারের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা:
বিলের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, পুলিশ কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই যেকোনো জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এমনকি এমন কোনো ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলে আশ্রয়দাতারও ২ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। ১৮ নম্বর ধারার বিশেষ রক্ষাকবচে “সৎ অভিপ্রায়ে” কাজ করার অজুহাতে পুলিশ ও সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও কার্যত আসাম্ভব হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনের নামে এই বিল আদতে সাধারণ নাগরিকের আইনি রক্ষাকবচ কেড়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ছক। আগামী দিনে এই বিলকে কেন্দ্র করে যে নবান্ন বনাম বিরোধী শিবিরের এক রক্তক্ষয়ী আইনি লড়াই শুরু হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।