“ছাত্র শক্তির বিরাট নৈতিক জয়”, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফায় উচ্ছ্বসিত এসএফআই

“ছাত্র শক্তির বিরাট নৈতিক জয়”, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফায় উচ্ছ্বসিত এসএফআই

দেশজুড়ে পরীক্ষা পরিচালনায় গোলযোগ এবং নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের জেরে অবশেষে পড়ুয়াদের তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়ে পদত্যাগ করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দীর্ঘ দিন ধরে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দেশব্যাপী সরব হয়েছিল ‘স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া’ (SFI)।

সংগঠনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ছাত্র সমাজ দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের আনাচে-কানাচে লাগাতার প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ২৫ জুলাই, ২০২৪ তারিখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার খবর সামনে আসতেই তা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক জয় হিসেবে আখ্যা দেন সৃজন। তিনি জানান, এই পদত্যাগ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং দেশজুড়ে লড়াই চালানো ছাত্র শক্তির এক বিরাট নৈতিক জয়। শিক্ষার্থীদের রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতার কাছে শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলো কেন্দ্রীয় সরকার।

এদিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর সামনে আসতেই দিল্লির যন্তর মন্তরে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি এই সাফল্যকে তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রতিবাদের ফল বলে উল্লেখ করেন। যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে অভিজিৎ দীপকে বলেন, “আমরা এটা করে দেখিয়েছি।” এরপরই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের জানান তিনি। মন্ত্রীর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে আন্দোলনস্থলে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। দীপকে পড়ুয়াদের আন্দোলন এবং তাঁদের লাগাতার প্রতিবাদের প্রচেষ্টাকে এই সাফল্যের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দেন।

উল্লেখ্য, দেশজুড়ে CJP এবং বিরোধী দলগুলির লাগাতার আন্দোলনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন তিনি। পদত্যাগের পর পড়ুয়াদের উদ্দেশে একটি চিঠি প্রকাশ করে নিজের সিদ্ধান্তের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এক্স-এ (টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ধর্মেন্দ্র প্রধান লিখেছেন, ‘‘প্রথম দিন থেকেই আমি এই পরিস্থিতির দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং কখনও তা থেকে পিছিয়ে আসিনি। আমার সংকল্প ছিল, কোনও মেধাবী পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ যেন পরীক্ষামাফিয়ার কারণে নষ্ট না হয় এবং কোনও শিক্ষার্থীর সঙ্গে যেন অন্যায় না হয়।’’

পড়ুয়াদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, যন্তর মন্তর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির সুযোগ যাতে কোনও ‘দেশবিরোধী শক্তি’ নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যাতে অটুট থাকে এবং কোনও পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ যাতে আইনি জটিলতায় আটকে না যায়—এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁর কথায়, দেশের পড়ুয়ারা যাতে নিজেদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করতে পারে, সেটিও তাঁর এই পদত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ।

ধর্মেন্দ্র প্রধান আরও জানান, গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পড়ুয়া, শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিশ্বাস, একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী দেশের সঠিক ভিত্তি তৈরি করে। দেশের তরুণ প্রজন্মের আশা, আবেগ এবং বৈধ দাবির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশসেবার সুযোগ পাওয়ার জন্যও বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

চিঠিতে নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন তিনি। ধর্মেন্দ্র প্রধানের দাবি, ২০২৬ সালের ৩ মে অনুষ্ঠিত NEET-UG পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় সরকার অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপ করে তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন তারিখ ঘোষণা করে। পাশাপাশি, পরবর্তী বছর থেকে কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা বা CBT পদ্ধতিতে NEET-UG আয়োজনের সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এরপর সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল ২০ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়ার পুনঃপরীক্ষা অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে এই কাজ দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পড়ুয়া ও অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় ২১ জুন সফলভাবে পুনঃপরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের দাবি, প্রথম দিন থেকেই তিনি গোটা পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল—কোনও মেধাবী পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ যেন পরীক্ষামাফিয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে যেন বিন্দুমাত্র অন্যায় না ঘটে। ১৬ জুলাই প্রকাশিত NEET-UG পরীক্ষার ফলাফলও অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে বলে দাবি করে তিনি জানান, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের বহু মেধাবী পড়ুয়া এই পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছেন।

তবে গত কয়েক দিনের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের গভীর উদ্বেগের কথা জানাতে ভোলেননি ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর অভিযোগ, দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে এবং বহু পড়ুয়াকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এই পুরো ঘটনায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত বলেও জানিয়েছেন।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের স্পষ্ট বক্তব্য, এই বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কিত নয়। ভারতের যুবশক্তিই দেশের প্রকৃত শক্তি এবং কোনো বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের জালে দেশের তরুণ প্রজন্মকে যেন বিভ্রান্ত হতে না দেওয়া হয়, এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন তিনি।

শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, তাঁর সঠিক নির্দেশনা, আস্থা ও সহযোগিতার জন্য তিনি চিরকৃতজ্ঞ। একইসঙ্গে তিনি নিজের মন্ত্রিসভার সহকর্মী, মন্ত্রকের আধিকারিক এবং সকল কর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান। মন্ত্রিত্ব ছাড়লেও দেশসেবাই তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, ভগবান জগন্নাথের আশীর্বাদ নিয়ে ভবিষ্যতেও ভারত, ওড়িশা এবং দেশের সমস্ত যুবসমাজের স্বপ্নপূরণে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত রাখার বার্তা দিয়েছেন প্রাক্তন এই শিক্ষামন্ত্রী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *