‘রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছিল!’ আত্মহত্যার আগে আক্ষেপ রামপুরহাটের ৫ বারের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের

রামপুরহাট: বীরভূমের রাজনীতিতে স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার তথা রামপুরহাটের পাঁচবারের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রবিবার সকালে রামপুরহাটের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় নিজের বাড়ির সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকেই উদ্ধার হয় তাঁর ঝুলন্ত দেহ। পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে রাজনীতি ও সাম্প্রতিক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তাঁর গভীর হতাশার কথা ফুটে উঠেছে।
ময়নাতদন্তের জন্য দেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন।
সুইসাইড নোটে আক্ষেপ ও ক্ষোভ উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে প্রয়াত আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন— “কোনও দিনই কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। সারাজীবন এক পয়সা কোনও কাজের বিনিময়ে নিইনি।” তিনি আরও যোগ করেন, “ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানেও কোনো দুর্নীতির সাথে জড়িত হইনি। রাজনৈতিক বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে, তবে কখনও শত্রুতার রূপ নেয়নি। সর্বদা সব দলীয় অন্যায়কে মেনে নিতে না পারলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি।”
নিজের নিঃকলঙ্ক ইমেজে দাগ লাগার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি লেখেন, DRDA-র জেনারেল কমিটির মিটিং ছাড়া তাঁর আর কোনো বড় দায়িত্ব বা টেন্ডার কমিটিতে ভূমিকা ছিল না। তাঁকে অহেতুক অপমান ও কলঙ্কিত করার চেষ্টার তীব্র ধিক্কার জানিয়ে তিনি লিখেছেন, “আজ তাই মনে হচ্ছে রাজনীতিতে আসাটাই খুব ভুল হয়েছে। আমার বংশের ছেলেদের রাজনীতি না করার পরামর্শ দিচ্ছি, ওরা ওদের নিজেদের কাজের মধ্যেই থাক।”
শেষ মুহূর্তের পরিবেশ শনিবার রাতেও তিনি স্বাভাবিকভাবে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নৈশভোজ সারেন এবং তার আগের দিন পর্যন্ত দলীয় কর্মীদের সঙ্গেও দেখা করেন। কিন্তু রবিবার সকালে জানলা দিয়ে স্থানীয়রা তাঁকে কার্যালয়ের ভেতর ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে হতভম্ব হয়ে যান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সফর ও মন্ত্রিত্ব অধ্যাপনার জগৎ থেকে রাজনীতিতে আসা এই প্রবীণ নেতা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পিএইচডি অর্জন করেন। প্রথমে কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনৈতিক জীবন শুরু করলেও ২০০১ সালে তৃণমূলে যোগ দিয়ে প্রথমবার রামপুরহাট থেকে বিধায়ক হন। এরপর ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১—টানা পাঁচবার তিনি এই আসন থেকে জয়ী হন।
২০১৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে তিনি প্রথমে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রাজ্যের কৃষিমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান। ২০২১ সালে নির্বাচনে জেতার পর ২ জুলাই তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার পদে আসীন হন এবং ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া অনুব্রত মণ্ডল জেলে যাওয়ার পর গঠিত জেলা তৃণমূলের কোর কমিটিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
পরাজয় ও সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট কেন্দ্র থেকে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। টানা বহু বছরের জয়ের পর এই পরাজয় এবং পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির সঙ্গে নাম জড়ানোর বিষয়টি তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল বলে জানা যাচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি দলীয় পদ ও সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন, যার করুণ পরিণতি ঘটল এই মর্মান্তিক ঘটনায়।