‘নাবালকরা আইনি চুক্তি করতে পারে না’, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে বয়সসীমা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট!

‘নাবালকরা আইনি চুক্তি করতে পারে না’, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে বয়সসীমা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট!

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা স্ন্যাপচ্যাটের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এক ক্লিকেই অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলছে নাবালকরা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— ভারতীয় আইন অনুযায়ী এটি কতটা বৈধ? ১৮ বছরের কম বয়সিরা কি আদৌ কোনও ডিজিটাল চুক্তিতে সই করতে পারে? এই বিষয়ে কেন্দ্র সরকারকে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সি বা নাবালকরা কোনও আইনি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে না। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলার সময় শর্তাবলী (Terms of Service) মেনে নেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি ১৮ বছরের কম বয়সিদের জন্য সংবিধিবদ্ধ আইনি নিয়মের আওতায় আনা যায় কিনা, তা অবিলম্বে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে কেন্দ্রকে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বিশেষ বেঞ্চে ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স’ নামক একটি এনজিও-র জনস্বার্থ মামলার (PIL) শুনানিতে এই বিষয়টি ওঠে। এনজিওটির পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট এইচ এস ফুলকা সওয়াল করে জানান, উপযুক্ত সুরক্ষা ও ডিজিটাল ফায়ারওয়াল না থাকায় নাবালকরা অভিভাবকের সাহায্য ছাড়াই অনায়াসে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে।

‘আইনের চোখে এই চুক্তি বাতিল’

শুনানিকালে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী কেন্দ্রের আইনজীবী তথা সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলেই ইউজারকে ‘টার্মস অফ সার্ভিস’ মেনে নিতে হয়, যা মূলত একটি আইনি চুক্তি।”

তিনি ১৮৭২ সালের ঐতিহাসিক ‘ইন্ডিয়ান কন্ট্রাক্ট অ্যাক্ট’-এর ১১ নম্বর ধারার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এই আইন অনুযায়ী কোনো নাবালকের সঙ্গে করা চুক্তি শুরু থেকেই বেআইনি ও বাতিল (void ab initio) বলে গণ্য হয়। ফলে একজন নাবালক একা কী করে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে এই চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ।

কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত প্রকাশ করে জানান, এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বেআইনি চুক্তি এবং সরকার এই বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করবে।

বিচারপতি বাগচী আরও যোগ করেন, বয়সসীমার এই নিয়মটি যেন কেবল কোনো সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে না থাকে। এটি ইন্টারমিডিয়ারি রুল ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে এনে সংবিধিবদ্ধ আইন হিসেবে রূপ দেওয়া যায় কিনা, তা কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভাবতে হবে।

অনলাইন ঝুঁকিতে শিশুরা

জনস্বার্থ মামলায় এনজিও-র তরফে জানানো হয়, সঠিক নজরদারির অভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশুরা প্রতিনিয়ত অনলাইন গ্রুমিং, যৌন ব্ল্যাকমেইল, সাইবার বুলিং ও মানসিক শোষণের মতো মারাত্মক বিপদের মুখে পড়ছে। বর্তমানে কেবল জন্মতারিখ দিলেই ১৩ বছরের বেশি যে কেউ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে, যা ভারতীয় আইনের পরিপন্থী।

মামলায় মূলত দুটি দাবি জানানো হয়েছে:

১. অভিভাবকের সম্মতি: ১৮ বছরের কম বয়সিদের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা বা আইনি অভিভাবকের সরাসরি সম্মতি (Parental Consent) বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২. কারিগরি ফায়ারওয়াল: শিশুরা যাতে একা অ্যাকাউন্ট না খুলতে পারে, তার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলিতে স্বয়ংক্রিয় টেকনিক্যাল ফায়ারওয়াল বসাতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ডিজিটাল যুগে শিশুদের সুরক্ষায় কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন একটি শক্তপোক্ত আইনি কাঠামো। এখন দেখার, কেন্দ্র সরকার এই চুক্তি আইনের কথা মাথায় রেখে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়মাবলীতে কী পরিবর্তন আনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *