দ্য কেরালা স্টোরি ২ নিয়ে তোলপাড়, কেরল হাইকোর্টের সবুজ সংকেতে কি নষ্ট হবে সামাজিক সম্প্রীতি

দ্য কেরালা স্টোরি ২ নিয়ে তোলপাড়, কেরল হাইকোর্টের সবুজ সংকেতে কি নষ্ট হবে সামাজিক সম্প্রীতি

কেরল হাইকোর্টের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর থেকেই ‘দ্য কেরল স্টোরি ২: গোজ বিয়ন্ড’ সিনেমাটি নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। একদিকে আদালতের আইনি লড়াইয়ে জয়, অন্যদিকে ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাপানউতোর— সব মিলিয়ে দক্ষিণ ভারতের এই শান্ত রাজ্যটির সামাজিক স্থিতিশীলতা এখন প্রশ্নের মুখে। সিনেমাটি কি কেবলই বিনোদন, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে সুদূরপ্রসারী কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য?

আইনি লড়াই ও আদালতের রায়

গত ২৪ ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার পর কেরল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এই ছবির স্ক্রিনিংয়ের ওপর থেকে সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া স্থগিতাদেশ তুলে নিয়েছে। ফলে ছবিটি প্রদর্শনে আর কোনো আইনি বাধা রইল না। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের মে মাসে কর্নাটক নির্বাচনের ঠিক আগে মুক্তি পেয়েছিল এই ছবির প্রথম ভাগ। এবার দ্বিতীয় ভাগটি এমন এক সময়ে আসছে যখন কেরলের রাজনৈতিক আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত।

তথ্যের সত্যতা বনাম ছবির দাবি

ছবির ট্রেলারে দাবি করা হয়েছে যে, হিন্দু ও খ্রিস্টান মহিলাদের ফুসলিয়ে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। তবে কেরল সরকারের ২০২০ ও ২০২৪ সালের গেজেট নোটিফিকেশন এই দাবির সঙ্গে সহমত নয়। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে:

  • ২০২০ সালের তথ্য: মোট ৫০৬ জন ধর্মান্তরিতের মধ্যে ২৪১ জনই হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৪৪ এবং ১১৯।
  • ২০২৪ সালের তথ্য: ৩৬५ জন হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছেন, যাদের বড় অংশই দলিত খ্রিস্টান ও মুসলিম। অন্যদিকে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন ২৭৬ জন।

গবেষক ও অধ্যাপিকা জে দেবিকা মনে করেন, এই ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে মালয়ালিদের নিজেদের রাজ্যেই একপ্রকার ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও মেরুকরণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছবির মাধ্যমে রাজ্যে হিন্দুত্বের জন্য উর্বর জমি তৈরির চেষ্টা চলছে। প্রবীণ বিশ্লেষক সানি কুট্টি আব্রাহাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই ছবি তৈরি হয়নি, বরং এর উদ্দেশ্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যকার সুসম্পর্ক নষ্ট করা।

অন্যদিকে, অধ্যাপক জে. প্রভাস মনে করেন, এর রাজনৈতিক প্রভাব এখনই হয়তো বড় আকারে দেখা যাবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে বিজেপি এর থেকে সুবিধা পেতে পারে। সিপিএম-এর মতো বামপন্থী দলগুলোর হিন্দু ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে এই ধরনের আখ্যান সাহায্য করতে পারে বলে তাঁর ধারণা।

রাজনেতাদের প্রতিক্রিয়া

কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন কঠোর ভাষায় এই ছবির সমালোচনা করে জানিয়েছেন, বাকস্বাধীনতার নামে একটি পুরো রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কংগ্রেস নেতা ভি ডি সতীশন এই ছবিকে বিজেপির ‘ফান্ডেড প্রজেক্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাজীব চন্দ্রশেখর এই বিষয়ে বিতর্ক এড়িয়ে গিয়েছেন।

সিনেমার পর্দা ছাপিয়ে এই বিতর্ক এখন কেরলের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিধানসভার অলিন্দে— সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শেষ পর্যন্ত এই ছবি কি কেবল বক্স অফিস মাতাবে, নাকি কেরলের সামাজিক বুনট ছিঁড়ে ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *