“সমুদ্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়!” হরমোজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও আমেরিকাকে কড়া হুঁশিয়ারি সিঙ্গাপুরের

“সমুদ্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়!” হরমোজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও আমেরিকাকে কড়া হুঁশিয়ারি সিঙ্গাপুরের

মধ্যপ্রাচ্যের হোরমুজ প্রণালী ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের অধিকার নিয়ে কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালকৃষ্ণান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ কোনো একক দেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সমুদ্রপথে জাহাজের অবাধ চলাচল কোনো দেশের দেওয়া বিশেষ সুবিধা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার।

হোরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন অবরোধের প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরের এই মন্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি শক্তিশালী বার্তা।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রাসঙ্গিকতা

সমুদ্রের সংবিধান হিসেবে পরিচিত ‘ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অফ দ্য সি’ (UNCLOS)-এর ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো উপকূলীয় দেশ আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। এই আইনের মূল দিকগুলো হলো:

  • নিরাপত্তা বা পরিবেশগত কারণ দেখিয়েও কোনো দেশ আন্তর্জাতিক জলপথের নৌ-চলাচল বন্ধ করতে পারবে না।
  • কোনো দেশ এই পথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল বা শুল্ক আরোপ করতে পারবে না।
  • জলপথ অবরোধ করা আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।

সিঙ্গাপুর এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার মূল কারণ হলো তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান। হোরমুজ প্রণালীর মতো ‘মালাক্কা’ ও ‘সিঙ্গাপুর’ প্রণালীও বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এই জলপথগুলোতে একবার বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে বা আইনের ব্যত্যয় ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ও ইরানের পালটা হুঁশিয়ারি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, ইরান অবৈধভাবে জাহাজ থেকে কোটি কোটি ডলার টোল আদায় করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন নৌবাহিনী ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে অবরোধ শুরু করেছে। অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে যে, এই সমুদ্রপথ তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং সেখানে কোনো বিদেশি সামরিক জাহাজের উপস্থিতি তারা সহ্য করবে না। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রের ওপর ‘সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ’ কায়েম করার আইনি সুযোগ কোনো দেশের নেই।

এশীয় দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

হোরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা বাড়লে তার প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বেশি পড়বে। বিশেষ করে ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো যারা অপরিশোধিত তেলের জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল।

  • জ্বালানি সংকট: সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে।
  • অর্থনৈতিক অস্থিরতা: তেলের দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সমুদ্রপথ শাসনের চেষ্টা আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। হোরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও আমেরিকার এই দ্বন্দ্ব যদি প্রশমিত না হয়, তবে বিশ্ব বাণিজ্য দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে পড়বে।

একঝলকে

  • সিঙ্গাপুরের দাবি: আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ কোনো দেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
  • আইনি বাধ্যবাধকতা: UNCLOS-এর ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জলপথ অবরোধ অবৈধ।
  • উত্তেজনার কারণ: মার্কিন অবরোধ ও ইরানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা।
  • প্রভাবিত দেশ: ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *