ইসরায়েলের পাশ থেকে সরছে বন্ধু রাষ্ট্রগুলো? মেলোনির ‘ইউ-টার্ন’ কি নেতানিয়াহুর জন্য বড় বিপদ?

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে ইজরায়েল। কয়েক দশক ধরে যে ইউরোপীয় দেশগুলো ইজরায়েলের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা এখন একে একে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সবথেকে বড় চমকটি এসেছে ইতালির পক্ষ থেকে। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইজরায়েলের সঙ্গে সমস্ত প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেছে ইতালি।
সমর্থন থেকে বিরোধিতার পথে ইউরোপ
ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৩ সালে গাজায় সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এই সমীকরণ পাল্টাতে শুরু করে। গাজায় হাজার হাজার নারী ও শিশুর মৃত্যু এবং হাসপাতাল ধ্বংসের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। ইতিপূর্বেই স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো ইজরায়েলের ভূমিকার প্রকাশ্য সমালোচনা করেছে। এবার সেই তালিকায় যোগ দিল ইতালি।
সংঘাতের মূল কারণ লেবানন পরিস্থিতি
ইতালির এই কঠোর অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে লেবানন ইস্যু। লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে (UNIFIL) ইতালীয় সৈন্যরা মোতায়েন রয়েছে। সম্প্রতি ইজরায়েলি বাহিনী সেই শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা চালালে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
- কূটনৈতিক প্রতিবাদ: হামলার পর ইতালিতে নিযুক্ত ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানায় রোম।
- কড়া বার্তা: ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, গাজায় যা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি লেবাননে হতে দেওয়া যাবে না। পাল্টা জবাবে ইজরায়েলও ইতালীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করলে সম্পর্কের অবনতি চরমে পৌঁছায়।
প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল ও সামরিক প্রভাব
২০০৩ সাল থেকে ইতালি ও ইজরায়েলের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর ছিল। এর আওতায় অস্ত্র সরবরাহ, যৌথ সামরিক মহড়া এবং গবেষণা চলত। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই চুক্তি নবায়ন করার নিয়ম থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতালি তা নবায়ন না করে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইজরায়েলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল ইতালি। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ থাকায় ইজরায়েলের সামরিক ভাণ্ডারে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে ইজরায়েল
ইউরোপীয় দেশগুলোর এই দূরত্ব বজায় রাখা ইজরায়েলের জন্য কেবল সামরিক নয়, বরং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করছে।
- বাণিজ্যিক ক্ষতি: ইজরায়েল তার প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ ইউরোপ থেকে আমদানি করে এবং মোট রপ্তানির ২৮ শতাংশ পাঠায় ইউরোপীয় দেশগুলোতে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে ইজরায়েলি অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
- একাকীত্ব: জাতিসংঘে ইজরায়েলের অন্যতম সমর্থক হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান সরকারের পতনও নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মিত্রমহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইজরায়েল এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি।
একঝলকে
- ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইজরায়েলের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করেছেন।
- লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের ওপর ইজরায়েলি হামলায় ক্ষুব্ধ ইতালি।
- ফ্রান্স, স্পেন ও ব্রিটেনের পর ইতালির এই সিদ্ধান্ত ইজরায়েলকে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে।
- ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইজরায়েলের অর্থনীতি বড় সংকটে পড়বে।
- অস্ত্র আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় ইজরায়েলের সামরিক সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে।