বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার পালাবদল: গত ৫০০ বছরে কতবার বদলেছে ওয়ার্ল্ড অর্ডার? জানুন অজানা ইতিহাস

বিগত ৫০০ বছরে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। একসময়ের প্রবল প্রতাপশালী শক্তিগুলো ধুলোয় মিশে গেছে, আর তাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন পরাশক্তি। আশ্চর্যজনকভাবে, এককালের কট্টর শত্রু দেশগুলো আজ সময়ের প্রয়োজনে একে অপরের ঘনিষ্ঠতম মিত্রে পরিণত হয়েছে।
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন
১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে ইউরোপীয় শক্তির আধিপত্য শুরু হয়। স্পেন এবং পর্তুগাল সমুদ্রপথে এশিয়া, আমেরিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করে। পরবর্তীতে এই দৌড়ে নাম লেখায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স। তৎকালীন এশীয় শক্তি, বিশেষ করে মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয়রা বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নতুন মেরুকরণ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসকে দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিল। একদিকে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ‘অ্যালাইড পাওয়ার্স’ বা মিত্রশক্তি। অন্যদিকে জার্মানি, ইতালি ও জাপানের ‘অক্ষশক্তি’। জার্মানির রণকৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ইউরোপে দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের সংঘাত এড়াতে এবং বাইরের শক্তির মোকাবিলা করতে ন্যাটো (NATO)-র মতো শক্তিশালী জোট গঠিত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধ এবং আমেরিকার একক আধিপত্য
সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) এবং আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা বিশ্বের একক সুপারপাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পরিবর্তনের পর বিশ্বের অধিকাংশ দেশই আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।
শত্রু থেকে মিত্র হওয়ার অবিশ্বাস্য রূপান্তর
বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় চমক হলো চিরশত্রুদের বন্ধুতে পরিণত হওয়া:
- জার্মানি ও ফ্রান্স: বিশ্বযুদ্ধে কোটি মানুষের রক্তক্ষয়ের নায়ক এই দুই দেশ এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
- আমেরিকা ও জাপান: পার্ল হারবার আক্রমণ এবং হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার তিক্ত স্মৃতি কাটিয়ে আজ তারা ঘনিষ্ঠ সামরিক ও বাণিজ্যিক মিত্র।
- ভারত ও আমেরিকা: একসময় আমেরিকার ঝোঁক পাকিস্তানের দিকে থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হলো আমেরিকা এবং দুই দেশ কৌশলগতভাবে একে অপরের পরিপূরক।
বর্তমান পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ ছড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ইস্যুতে ইসরায়েল ও আমেরিকার পদক্ষেপ নতুন দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছিল। তবে আশার কথা হলো, দীর্ঘ সংঘাতের পর উভয় পক্ষই এখন আলোচনার টেবিলে বসে শান্তি স্থাপনে সম্মত হয়েছে। বিশ্ব ব্যবস্থার এই বিবর্তন প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই; স্বার্থের প্রয়োজনে শত্রুরাও বন্ধু হতে পারে।
একঝলক
- ১৫শ-১৬শ শতাব্দীতে স্পেন ও পর্তুগালের বিশ্ব আধিপত্য শুরু।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যাটো গঠন এবং ইউরোপীয় ঐক্যের সূচনা।
- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকার একক পরাশক্তি হিসেবে উত্থান।
- জার্মানি-ফ্রান্স এবং আমেরিকা-জাপানের বৈরিতার অবসান ও বন্ধুত্ব।
- বর্তমানে ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আমেরিকার অবস্থান।
- ইরান কেন্দ্রিক উত্তেজনার পর শান্তি আলোচনার ইতিবাচক ইঙ্গিত।