প্রচার শেষ! বুধবার ভাগ্য নির্ধারণ ১৪২ আসনের, শেষবেলার বিক্ষিপ্ত অশান্তিতে কপালে ভাঁজ কমিশনের

প্রচার শেষ! বুধবার ভাগ্য নির্ধারণ ১৪২ আসনের, শেষবেলার বিক্ষিপ্ত অশান্তিতে কপালে ভাঁজ কমিশনের

একদিকে প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী। একই দিনে রাজ্য জুড়ে প্রচার চালালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে শাসকদলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সোমবার সন্ধ্যায় শেষ হল পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত দফার ভোটপ্রচার। আগামী ২৯ এপ্রিল (বুধবার) রাজ্যের বাকি ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ। তবে প্রথম দফার মতো এই দফার প্রাক-ভোট পরিস্থিতি পুরোপুরি ‘শান্তিপূর্ণ’ রইল না। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে পূর্ব বর্ধমান— রাজ্যের নানা প্রান্তে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবরে তটস্থ নির্বাচন কমিশন। যুযুধান দুই শিবিরের শীর্ষ নেতারাই এদিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বাকি সব হিসাব হবে আগামী ৪ মে, ভোটের ফলপ্রকাশের পর। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক শেষ দিনের প্রচারে কে কী বার্তা দিলেন।

মোদীর ‘গ্যারান্টি’ ও প্রত্যয়

দ্বিতীয় দফার ভোটের শেষ দিনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাজ্যে একটিমাত্র সভা করেন উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দলে, যেখানে রবিবার রাতেই তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে উত্তেজনা ছড়ায়। সেই সভামঞ্চ থেকে মোদী তোষণের রাজনীতি থেকে পশ্চিমবঙ্গকে মুক্তির ‘গ্যারান্টি’ দেন। তিনি বলেন, “আপনারা ৭০ বছর কংগ্রেস, বাম, তৃণমূলকে দিয়েছেন। একটা সুযোগ বিজেপি-কে দিন।” এদিনের সভায় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত প্রত্যয়ী সুরে জানান, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসছেই এবং আগামী ৪ মে-র পর বিজেপির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাঁকে ফের বাংলায় আসতে হবে।

মমতার স্লোগান বদল: ‘বদল নয়, বদলা চাই’

এবারের নির্বাচনী স্লোগানে তাৎপর্যপূর্ণ বদল এনেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সালের ‘বদল চাই, বদলা নয়’ স্লোগান বদলে এবার তিনি বলছেন, ‘বদল নয়, বদলা প্রয়োজন’— বাংলাকে খাটো করার বদলা। নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্যের পুলিশের একাংশ বিজেপির কথায় কাজ করছে বলে অভিযোগ তুলে মমতা হুঁশিয়ারি দেন, ভোটের ফলপ্রকাশের পর সেই পুলিশকর্তাদের ‘মনে রাখা হবে’। শেষ দিনে কোনও জনসভা না করলেও দক্ষিণ কলকাতায় তিনটি মেগা পদযাত্রা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নিশ্চিত, আরও বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে চতুর্থবারের জন্য রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরছে তৃণমূল।

অমিত শাহের ‘সোজা’ করার হুঁশিয়ারি

প্রতিটি জনসভা থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তৃণমূলের ‘গুন্ডা’দের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ২৯ এপ্রিল কেউ সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখাতে এলে ৫ মে-র পর তাদের উল্টো করে ‘সিধা’ করা হবে। এদিন তিনি বেহালা পশ্চিম এবং চন্দননগরে রোড শো করেন। পাশাপাশি কপিল মুনির আশ্রমে পুজো দেন শাহ। ভোটারদের আশ্বস্ত করে তিনি জানান, ভোট শেষে আরও সাত দিন বাংলায় সিআরপিএফ থাকবে, তাই হিংসার কোনও জায়গা থাকবে না।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডিজে’ এবং কড়া নজর

তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এবার তৃণমূলের জয়ের পর রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি ডিজে-ও বাজবে। এদিন আরামবাগের তৃণমূল সাংসদ মিতালি বাগের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম করে অভিষেক হুঁশিয়ারি দেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বেছে বেছে হামলাকারীদের চিহ্নিত করা হবে এবং ৪ তারিখের পর সব হিসাব বুঝে নেওয়া হবে। এদিন তিনি বাটা মোড়ে রোড শো সহ মোট চারটি নির্বাচনী কর্মসূচি পালন করেন।

যোগী আদিত্যনাথের ‘বুলডোজার’ দাওয়াই

দ্বিতীয় দফার শেষ প্রচারে নিজের সুপরিচিত ‘বুলডোজার’ ইমেজ নিয়েই হাজির ছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তারকনাথ মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর ধনেখালির সভা থেকে তিনি কড়া ভাষায় তৃণমূলকে আক্রমণ করেন। যোগী জানান, রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হলে গুন্ডাদের শায়েস্তা করা হবে এবং তারকেশ্বরের মন্দিরে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের মতো প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হবে।

কমিশনের কড়া নজরদারি

ভোটের মাত্র দু’দিন আগে থেকে জগদ্দল, গোঘাট, পূর্বস্থলী এবং ভাঙড়ের মতো বেশ কিছু এলাকায় দুই দলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও জখম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রথম দফার ভোট নির্বিঘ্নে মিটলেও, দ্বিতীয় দফার আগে এই বিক্ষিপ্ত অশান্তি কমিশনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন নির্বাচন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিবেদক: স্বাধীন মানব দাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *