‘রণহুঙ্কার’ মধ্যপ্রাচ্যে: কেন মাত্র তিন দিনের সময়সীমা দিলেন ট্রাম্প? চাণক্য চালে পাল্টা ইরান

পশ্চিম এশিয়ায় ঘনিয়ে আসা যুদ্ধ মেঘের মাঝে আমেরিকা ও ইরানের বাগযুদ্ধ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় দফার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সংসদ স্পিকার মহম্মদ বাকের কালিবাফের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘৩ দিন’-এর হুঁশিয়ারি ও নেপথ্য কারণ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ইরানকে তিন দিনের চরম সময়সীমা (Deadline) দিয়েছেন। তাঁর এই হুঁশিয়ারির পেছনে রয়েছে একটি বড় প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সমীকরণ:
- পাইপলাইন বিস্ফোরণের আশঙ্কা: ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান বর্তমানে কোনও তেল রফতানি করতে পারছে না। তাদের মজুত ট্যাঙ্কগুলো (Storage Tanks) ইতিমধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ।
- চাপের মুখে পরিকাঠামো: যখন বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ লাইনে থাকে কিন্তু তা বের করার পথ বন্ধ থাকে, তখন পাইপলাইনের ভেতরে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। ট্রাম্পের মতে, আগামী তিন দিনের মধ্যে যদি ইরান কোনও চুক্তিতে না আসে, তবে এই অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে তাদের প্রধান তেল পাইপলাইনগুলো ফেটে যেতে পারে।
- অপূরণীয় ক্ষতি: এই পাইপলাইনগুলো একবার ধ্বংস হলে তা পুনর্নির্মাণ করা ইরানের পক্ষে প্রায় আসাম্ভব হয়ে পড়বে, যা দেশটির অর্থনীতিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।
ইরানের ‘তুরুপের তাস’: কালিবাফের পাল্টা হুঙ্কার
ট্রাম্পের এই ‘পাইপলাইন কূটনীতি’র জবাবে ইরানের সংসদ স্পিকার কালিবাফ দাবি করেছেন যে, আমেরিকার সব কৌশল শেষ হয়ে গেলেও ইরানের হাতে এখনও বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো তিনটি প্রধান তুরুপের তাস রয়েছে:
- হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz): ইরান বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচলে টোল আদায় করছে। কালিবাফ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান চাইলে এই পথটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। এতে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ থমকে যাবে।
- বাব আল-মানদেব (Bab al-Mandeb): লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথটি হুথিদের মাধ্যমে ইরান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। এটি বন্ধ হলে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে তেলের হাহাকার শুরু হবে।
- আঞ্চলিক তেল পরিকাঠামো: ইরান এমন সব দেশের তেল পাইপলাইনের ওপর হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা এশীয় দেশগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। কালিবাফের দাবি, ইরান তার সব তাস খেললে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে।
অচলাবস্থা কাটানোর ‘তিন দফা’ প্রস্তাব ও বর্তমান স্থিতি
ইরান বর্তমানে আলোচনার জন্য একটি তিন-পর্যায়ের প্রক্রিয়ার প্রস্তাব দিয়েছে:
- প্রথমত, হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া।
- দ্বিতীয়ত, বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো।
- তৃতীয়ত, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা করা।
তবে হোয়াইট হাউস এই প্রস্তাবে এখনই সায় দিচ্ছে না। মার্কিন প্রশাসনের সাফ কথা, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের স্থায়ী নিশ্চয়তা না পেলে কোনও চুক্তি হবে না। ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে ‘সিচুয়েশন রুমে’ চূড়ান্ত আলোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ওই তিন দিনের সময়সীমার দিকে—টেবিলে শান্তি ফিরবে নাকি সমুদ্রে শুরু হবে এক বিধ্বংসী বিপ্লব।
প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন স্বাধীন মানব দাস।