গণতন্ত্র রক্ষায় তবে কেন ব্রাত্য প্রধান বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে বড় প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের

গণতন্ত্র রক্ষায় তবে কেন ব্রাত্য প্রধান বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে বড় প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে (সিজেআই) বাদ দেওয়া নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। সিবিআই ডিরেক্টর বাছাইয়ের কমিটিতে প্রধান বিচারপতি থাকতে পারলে, দেশের গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্যানেলে কেন তিনি বা কোনও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি থাকবেন না, তা নিয়ে কেন্দ্রকে তীব্র বার্তা দিয়েছে শীর্ষ আদালত। জাতীয় নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আইনের শাসন বনাম গণতন্ত্র রক্ষা

মামলার শুনানির সময় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত দেশের শাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা বা ‘রুল অফ ল’ বজায় রাখার জন্য সিবিআই ডিরেক্টর নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের গণতন্ত্র রক্ষা এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কেন তাঁর মতো কোনও নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব থাকতে পারবেন না? আদালত স্পষ্ট করেছে যে, তারা কেবল প্রধান বিচারপতিকেই ওই পদে বসানোর দাবি করছে না, বরং কার্যনির্বাহী বিভাগের বাইরে কোনও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সদস্যের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

একতরফা সিদ্ধান্তের আশঙ্কা ও নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বাছাই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধী দলনেতা থাকেন। ফলে যে কোনও সিদ্ধান্তে সরকারের পক্ষে ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা স্বাভাবিক। সুপ্রিম কোর্ট আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই কাঠামোর কারণে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কার্যত নির্বাহী বিভাগের একতরফা নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে মন্ত্রিসভার কোনও সদস্য ভোট দেবেন, এমন সম্ভাবনা বাস্তবে ক্ষীণ। ফলে বিরোধী দলনেতার ভিন্ন মত থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছাই প্রতিফলিত হবে, যা নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন সংস্থার নিরপেক্ষতাকে বিঘ্নিত করতে পারে।

সংসদের আইন ও আদালতের ক্ষমতা

শুনানিতে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, আইন তৈরির চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদের রয়েছে। এর জবাবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সংসদের আইন প্রণয়নের অধিকারকে তারা সম্মান করে, কিন্তু সেই আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা করার অধিকার কেবল আদালতেরই রয়েছে। কার্যনির্বাহী বিভাগের এই প্রচ্ছন্ন ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে একচ্ছত্র আধিপত্য দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলেই মনে করছে শীর্ষ আদালত। এই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *