যুগান্তকারী রায়: ভোজশালা দেবী সরস্বতীর মন্দির, নমাজের অনুমতি বাতিল করল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

মধ্যপ্রদেশের ধারের বিতর্কিত ভোজশালা মন্দির-কমল মৌল মসজিদ প্রাঙ্গণের মালিকানা নিয়ে কয়েক দশকের পুরনো আইনি বিবাদের অবসান ঘটল। এক যুগান্তকারী রায়ে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, বিতর্কিত ওই প্রাঙ্গণটি মূলত দেবী বাগদেবী সরস্বতীর মন্দির। বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা এবং বিচারপতি অলোক অবস্থির সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ঐতিহাসিক নথিপত্র, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং সাহিত্যিক প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আদালতের এই রায়ের ফলে ২০০৩ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই) কর্তৃক মুসলিমদের সেখানে নমাজ পড়ার যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল হয়ে গেল।
হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, এই স্থানে বহু সময় ধরে হিন্দু উপাসনার একটি ধারাবাহিকতা ছিল, যা সময়ের পরিক্রমায় কিছুটা নিয়ন্ত্রিত বা বিধিবদ্ধ হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই স্থানটি একাদশ শতাব্দীর পারমার বংশীয় শাসক রাজা ভোজের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি তৎকালে সংস্কৃত শিক্ষার একটি অন্যতম কেন্দ্র ছিল। ফলে এই এলাকার ধর্মীয় চরিত্রটি মূলত ‘ভোজশালা’ বা দেবী সরস্বতীর মন্দির হিসেবেই গণ্য হবে। পূর্বে এই স্থানে হিন্দুরা প্রতি মঙ্গলবার পুজো এবং মুসলিমরা প্রতি শুক্রবার নমাজ আদায়ের সুযোগ পেতেন, যা দীর্ঘকাল ধরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক সংবেদনশীল উত্তেজনার কারণ ছিল। আদালতের নতুন রায়ে পূর্বের সেই বিজ্ঞপ্তি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বিকল্প জমি ও এএসআই-এর নিয়ন্ত্রণ
স্মৃতিস্তম্ভটির ওপর হিন্দুদের একচেটিয়া দাবি ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আদালত মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতিও নজর রেখেছে। হাইকোর্ট জানিয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আবেদন করলে মধ্যপ্রদেশ সরকার ধার জেলার সীমানার মধ্যেই একটি নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জমি বরাদ্দের বিষয়টি আইন অনুযায়ী বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে যে, ‘প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং অবশেষ আইন’-এর অধীনে এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই)-এর পূর্ণ তত্ত্বাবধানমূলক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।
লন্ডন থেকে মূর্তি ফেরানোর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই রায়ের পর হিন্দু আবেদনকারীদের দীর্ঘদিনের আরেকটি দাবি জোরালো হয়েছে। বর্তমানে লন্ডনের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত দেবী সরস্বতীর প্রাচীন মূর্তিটি ভারতে ফিরিয়ে এনে ভোজশালা চত্বরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে আদালত। এদিকে হাইকোর্টের এই রায়ের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এআইএমআইএম (AIMIM) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। এই রায়ের সঙ্গে বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের সুস্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে দাবি করে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্ট দ্রুত এই আদেশটি সংশোধন ও বাতিল করবে। এর আগে এএসআই-এর বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, ঐতিহাসিক শিলালিপি এবং স্থাপত্যশৈলী নিয়ে হিন্দু, মুসলিম ও জৈন সম্প্রদায়ের পরস্পরবিরোধী দাবির পর অবশেষে হাইকোর্টের এই রায় ভারতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে চলেছে।