মহার্ঘ পেট্রোল-ডিজেল, খুচরো বাজারে আগুন লাগার আশঙ্কা, কীভাবে প্রভাবিত হবে আপনার রান্নাঘরের বাজেট?

সাধারণ মানুষের পকেটে ফের এক বিরাট ধাক্কা দিল মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার জেরে দীর্ঘ বিরতির পর দেশজুড়ে এক ধাক্কায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি। শুধু তাই নয়, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলিতে সিএনজি (CNG)-র দামও কেজি প্রতি ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির এই আচমকা মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মধ্যবিত্তের পকেট এবং তাঁদের রান্নাঘরের মাসিক বাজেটে বড়সড় টান ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩ মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ল ৫০%
হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিকে দায়ী করেছে সরকার ও তেল কো ম্পা নিগুলি।
- মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকার মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-তে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
- দাম ১০০ ডলার পার: এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে গত মাত্র তিন মাসে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম ব্যারেল প্রতি ৭৫ ডলার থেকে একলাফে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ থেকে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ঘরোয়া বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না বলে দাবি তেল সংস্থাগুলির।
আপনার দৈনন্দিন খরচ ও রান্নাঘরের বাজেটে এর কী প্রভাব পড়বে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পেট্রোল পাম্পের চত্বরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পরোক্ষভাবে প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন যাপনকে ব্যয়বহুল করে তুলবে।
- কাঁচাবাজার ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি: ভারতের পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজেলচালিত ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহণ খরচ (Freight Charges) বৃদ্ধি পাবে। এর জেরে পাইকারি ও খুচরো বাজারে দূরদূরান্ত থেকে আসা শাকসবজি, ফল, দুধ, ভোজ্য তেল এবং চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম এক ধাক্কায় বেশ কিছুটা বেড়ে যাবে।
- নিত্যব্যবহার্য জিনিস মহার্ঘ: এফএমসিজি (FMCG) অর্থাৎ সাবান, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে প্যাকেটজাত খাবার, স্টিল এবং ই-কমার্স ক্ষেত্রে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বাড়বে। এর ফলে অনলাইন ডেলিভারি চার্জ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘরোয়া ব্যবহারের সমস্ত পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
- যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি: ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাইক ব্যবহারকারীদের পকেটের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ গণপরিবহণের খরচও বাড়বে। সিএনজি ও ডিজেল মহার্ঘ হওয়ায় আগামী দিনে বাস, অটো ও অ্যাপ-ক্যাবের ভাড়া বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা অফিসযাত্রীদের দৈনিক খরচ বাড়িয়ে দেবে।
দাম কি আরও বাড়তে পারে?
ব্যাঙ্ক অফ বরোদার প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সবনবীশের মতে, তেল কো ম্পা নিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত দামের কারণে বিপুল লোকসান সামাল দিচ্ছিল। ফলে মাত্র ৩ টাকা দাম বাড়ালে তাদের সেই ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আগামী দিনে পেট্রোল-ডিজেলের দাম আরও একদফা বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, এমকে গ্লোবালের অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরা জানিয়েছেন, দেশের উপভোক্তা মূল্য সূচক (CPI) বা খুচরো মুদ্রাস্ফীতির প্রায় ৫ শতাংশ সরাসরি পেট্রোল ও ডিজেলের দামের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই ৩ টাকার প্রভাব সরাসরি দেশের খুচরো মুদ্রাস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী করবে। তবে সরকারের হস্তক্ষেপে কো ম্পা নিগুলো যদি এই বিশ্ববাজারের পুরো বোঝা গ্রাহকদের ওপর না চাপায়, তবে মুদ্রাস্ফীতি ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে কারণ যাই হোক না কেন, উৎসবের মরসুমের আগে এই জ্বালানির ছ্যাঁকা মধ্যবিত্তের হেঁশেলের শান্তি যে কেড়ে নিল, তা বলাই বাহুল্য।