ডাকঘরের সুদে রাশ টানার পরামর্শ রিজার্ভ ব্যাংকের, ব্যাংকিং ক্ষেত্রকে বাঁচাতে কেন্দ্রকে চিঠি

দেশের সার্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির তারল্য সংকট (Liquidity Crunch) দূর করতে এবার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI)। ডাকঘরের (Post Office) বিভিন্ন জনপ্রিয় স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলিতে (Small Savings Schemes) ব্যাংকের তুলনায় সুদের হার অনেকটাই বেশি থাকায় সাধারণ মানুষ সেদিকে বেশি ঝুঁকছেন। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিতে আমানত বা জমার পরিমাণ (Bank Deposits) আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, যা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বন্ডের হারের (Government Bond Yields) সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডাকঘরের স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার যৌক্তিকভাবে কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে জরুরি পরামর্শ ও প্রস্তাব পাঠিয়েছে আরবিআই।
নিয়ম ভেঙে ১.৪১% পর্যন্ত বেশি সুদ, দাবি আরবিআই-এর
রিজার্ভ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পেশ করা রিপোর্টে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনা হয়েছে। আরবিআই জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী সরকারি বন্ডের লভ্যাংশের ওপর ভিত্তি করে এই স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলির সুদের হার নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্র সরকার এই প্রকল্পগুলিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে সর্বোচ্চ ০.৫% থেকে শুরু করে ১.৪১% পর্যন্ত অতিরিক্ত বা বেশি সুদ দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (SSA), সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম (SCSS) বা পিপিএফ (PPF)-এর মতো প্রকল্পগুলিতে বর্তমানে ৭.১% থেকে ৮.২% পর্যন্ত নিশ্চিত রিটার্ন মিলছে। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি ফিক্সড ডিপোজিটে (FD) দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ ৭% থেকে ৭.৫%-এর বেশি সুদ দিতে পারছে না। এই বিপুল পার্থক্যের কারণেই আমজনতা ব্যাংকের বদলে ডাকঘরে টাকা রাখা বেশি লাভজনক মনে করছেন।
ব্যাংকগুলির আমানত সংকট ও ঋণের বাজারে টান
আরবিআই তাদের উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে:
- জমার হার হ্রাস: গত কয়েক কোয়ার্টারে ব্যাংকগুলির আমানত বৃদ্ধির হার (Deposit Growth) ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে ১০.৮%-এ নেমে এসেছে।
- ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি: বিপরীতে দেশের বাজারে বাণিজ্যিক ঋণের চাহিদা (Credit Demand) ১৩% থেকে ১৪% হারে বাড়ছে।
- ভারসাম্যহীনতা: ব্যাংকগুলির কাছে পর্যাপ্ত আমানত বা গচ্ছিত টাকা না থাকলে তারা বাজারে ঋণ দিতে পারবে না। এর ফলে দেশের শিল্প ক্ষেত্রে পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি থমকে যেতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বন্ডের সাথে সামঞ্জস্য রাখার পরামর্শ
এই আর্থিক ভারসাম্যহীনতা কাটাতে রিজার্ভ ব্যাংক অর্থমন্ত্রককে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে অবিলম্বে ডাকঘরের স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বন্ডের হারের ওপর ভিত্তি করে যে ফর্মুলা তৈরি করা আছে, তা কঠোরভাবে মেনে সুদের হার কিছুটা কমানো হলে মানুষ আবার ব্যাংকে আমানত রাখতে উৎসাহিত হবেন।
তবে মধ্যবিত্ত ও প্রবীণ নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে কেন্দ্র সরকার আগামী জুন ত্রৈমাসিকের (Quarter) পর্যালোচনা বৈঠকে এই সুদের হারে কোনো কোপ বসায় কি না, নাকি ব্যাংকগুলির জন্য অন্য কোনো বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা করে, এখন সেদিকেই নজর দেশের অর্থনৈতিক মহলের।