ঐতিহাসিক ধস, ডলারের সামনে টাকার নজিরবিহীন আত্মসমর্পণ
/indian-express-bangla/media/media_files/2026/05/18/indian-rupee-hits-all-time-low-against-us-dollar-economic-crisis-warning-2026-05-18-12-55-30.jpg?w=1280&resize=1280,720&ssl=1)
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে দেশীয় অর্থনীতিতে বড়সড় ধাক্কা নেমে এল। সপ্তাহের প্রথম লেনদেনের দিনই মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার দর নেমে গেছে সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে। সোমবার বাজার খোলার পর ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার মূল্য প্রথমবারের মতো ৯৬.২৩ টাকার বিপজ্জনক রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলে। এর আগে গত শুক্রবার বাজার বন্ধের সময় টাকার দর ছিল ৯৫.৯৭। সপ্তাহান্তের ছুটির পর বাজার পুনরুজ্জীবিত হতেই টাকার এই ঐতিহাসিক দরপতন ঘটে, যা পূর্বের সর্বকালের সর্বনিম্ন রেকর্ড ৯৬.১৩৫০-কেও ছাপিয়ে গেছে।
মুদ্রা বাজারের এই নজিরবিহীন অস্থিরতা রুখতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গত শুক্রবারও পরোক্ষভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকার এই আকস্মিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পতনকে পুরোপুরি থামানো অত্যন্ত কঠিন।
পতনের নেপথ্যে ভূ-রাজনীতি ও তেলের বাজার
টাকার এই রেকর্ড পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম। বর্তমানে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১১ মার্কিন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। উপরন্তু, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে, ফলে তেলের দাম বাড়ায় দেশের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তেল আমদানিকারকদের বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজনীয়তা বাজারে ডলার কেনার প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি কোপ পড়েছে টাকার ওপর।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকেত এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি। ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ইরানকে চরম সতর্কবার্তা দেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে ভারতের মতো উদীয়মান বাজার থেকে নিজেদের তহবিল তুলে নিচ্ছেন। এই ব্যাপক মূলধন প্রত্যাহারের ফলে ভারতীয় শেয়ার বাজারে যেমন ধস নেমেছে, তেমনই টাকার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ার আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি (CAD) বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব ভারসাম্যের চরম অবনতি ঘটতে পারে। টাকার এই নজিরবিহীন অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে সাধারণ মানুষের পকেটে। এর ফলে বিদেশ যাত্রা, বিদেশে পড়াশোনা থেকে শুরু করে চিকিৎসা সবকিছুই আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
একই সাথে ভারত বাইরে থেকে যে সমস্ত পণ্য আমদানি করে, যেমন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও গাড়ির যন্ত্রাংশ, সেগুলির দাম একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং তেলের চড়া দামের কারণে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন খরচ এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যাবে, যা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মধ্যবিত্তের পারিবারিক বাজেটে বড়সড় টান ফেলবে।