এআই আতঙ্ক কাটিয়ে দলাল স্ট্রিটে ধামাকা প্রত্যাবর্তন, একলাফে ৪ শতাংশ বাড়ল নিফটি আইটি

এআই আতঙ্ক কাটিয়ে দলাল স্ট্রিটে ধামাকা প্রত্যাবর্তন, একলাফে ৪ শতাংশ বাড়ল নিফটি আইটি

বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা লাগাতার রক্তক্ষরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর আগ্রাসী উত্থানের জেরে তৈরি হওয়া তীব্র আতঙ্কের অবসান ঘটল দলাল স্ট্রিটে। মঙ্গলবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে এক প্রকার ধামাকা প্রত্যাবর্তন ঘটাল তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি (IT) ক্ষেত্রের শেয়ারগুলি। সপ্তাহের দ্বিতীয় কাজের দিনে বিনিয়োগকারীদের হাত ধরে এক ধাক্কায় প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি লাফ দিল ‘নিফটি আইটি’ (Nifty IT) সূচক। মূলত কোফোর্জ, এমফ্যাসিস, পারসিস্টেন্ট সিস্টেমস, টেক মহিন্দ্রা, ইনফোসিস এবং টিসিএস (TCS)-এর মতো বড় ও মাঝারি আইটি সংস্থাগুলির শেয়ারে ব্যাপক কেনাকাটার জেরেই এই রূপালী রেখা দেখা গেছে বাজারে।

এদিনের ট্রেডিং সেশনে সবথেকে বেশি লাভবান হয়েছে কোফোর্জ, যার শেয়ার দর একলাফে প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, এমফ্যাসিস, পারসিস্টেন্ট সিস্টেমস এবং টেক মহিন্দ্রার মতো নামী সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের দুই প্রধান স্তম্ভ বা হেভিওয়েট সংস্থা, ইনফোসিস এবং টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS)-এর শেয়ার দরও মঙ্গলবার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে নিফটি এবং সেনসেক্সের মতো মূল সূচকগুলিকে ঊর্ধ্বমুখী করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

আইটি সেক্টরের মন্দাভাব ও এআই সুনামি

চলতি বছরের শুরু থেকেই ভারতীয় আইটি স্টকগুলি এক নজিরবিহীন ও কঠিন সংশোধনের (Correction) মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিশ্ব বাজারে ভারতীয় সফটওয়্যার ও আউটসোর্সিং ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে লগ্নিকারীদের মনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে সম্প্রতি ওপেনএআই (OpenAI) নামক প্রথম সারির এআই সংস্থা তাদের নতুন শাখা ‘ওপেনএআই ডিপ্লয়মেন্ট কো ম্পা নি’ চালু করার পর এই আতঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায়। লগ্নিকারীদের বড় অংশের মনে ভয় তৈরি হয়েছিল যে, এআই চালিত অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির জেরে প্রথাগত সফটওয়্যার সার্ভিস এবং কোডিং-এর মতো কাজের চাহিদা চিরতরে কমে যেতে পারে। এর পাশাপাশি, আমেরিকার ধীর অর্থনৈতিক গতিগতি, বিশ্বজুড়ে ক্লায়েন্টদের খরচ কমানোর প্রবণতা এবং শীর্ষস্থানীয় আইটি সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ আয়ের দুর্বল পূর্বাভাস বাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছিল। যেহেতু ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির আয়ের একটা সিংহভাগ আসে উত্তর আমেরিকা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে, তাই আমেরিকার সুদের হারের ওঠানামা বা অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় এই সেক্টরটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্যে প্রধান কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

বিগত কয়েক মাসের টানা বিক্রির জেরে আইটি স্টকগুলির মূল্যায়ন (Valuation) অনেকটাই সস্তা ও আকর্ষণীয় স্তরে নেমে এসেছিল। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা এই সুযোগ হাতছাড়া না করে ইনফোসিস বা পারসিস্টেন্ট-এর মতো শক্তিশালী ডিজিটাল ও ক্লাউড ক্ষমতাসম্পন্ন শেয়ারগুলি সস্তায় কিনতে শুরু করেন। এর ফলে বাজারে আইটি শেয়ারের পতনের ওপর বাজি ধরা ট্রেডাররা (Short Sellers) এদিন শেয়ারের স্থিতিশীলতা দেখে তড়িঘড়ি নিজেদের পজিশন স্কোয়ার-অফ বা কভার করতে বাধ্য হন, যা সূচকের গতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া মার্কিন ট্রেজারি ইল্ডের সামান্য পতন এবং সেদেশে সুদের হার আর না বাড়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত আইটি সেক্টরকে স্বস্তি দিয়েছে। এর পাশাপাশি ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার সামান্য দুর্বলতাও রপ্তানিমুখী আইটি সংস্থাগুলির পক্ষে সহায়ক হয়েছে। মঙ্গলবারের বাজারে লার্জক্যাপ সংস্থাগুলির তুলনায় মিডক্যাপ বা মাঝারি সারির প্রযুক্তি সংস্থাগুলির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

তবে এই ব্যাপক উত্থানের পরেও বাজার বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিতে ছাড়ছেন না। তাঁদের মতে, আইটি সেক্টরের এই অস্থিরতা এখনই পুরোপুরি কেটে গেছে বলা যাবে না। আগামী দিনে বিশ্ববাজারের ক্লায়েন্টরা তাদের আইটি বাজেট কতটা বাড়ায়, ভারতীয় সংস্থাগুলি কত দ্রুত এআই প্রযুক্তির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং মার্কিন অর্থনীতি বড়সড় মন্দা এড়াতে পারে কিনা, তার ওপরেই নির্ভর করবে এই মেগা র্যালির দীর্ঘস্থায়িত্ব। তবে সাময়িকভাবে হলেও, মঙ্গলবারের এই জোরালো উত্থান প্রমাণ করে দিল যে ভারতের ঝোড়ো আইটি সেক্টরের ওপর থেকে লগ্নিকারীদের আস্থা এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *