দেশে আত্মপ্রকাশ নতুন রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি

ভারতের রাজনীতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিহাসে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ও চরম ব্যঙ্গাত্মক ঘটনা। কোনো রাজনৈতিক পরিবার বা মতাদর্শের হাত ধরে নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পাল্টা প্রতিবাদ হিসেবে জন্ম নিল এক নতুন ভার্চুয়াল সংগঠন— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস’ দল হিসেবে দাবি করা এই ডিজিটাল গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের দুই হাই-প্রোফাইল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদ। আত্মপ্রকাশের মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এই অভিনব প্ল্যাটফর্মের সদস্য সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা নেটপাড়ায় রীতিমতো ভাইরাল।

বিতর্কের কেন্দ্রে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর ‘মৌখিক পর্যবেক্ষণ’

এই প্রতিবাদের সূত্রপাত দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানি চলাকালীন তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বর্তমানে দেশের কর্মহীন বা বেকার যুবকেরা কোথাও সুবিধা করতে না পেরে সাংবাদিকতা, সমাজকর্মী কিংবা আইনের মতো পেশাকে আঁকড়ে ধরছেন। অভিযোগ ওঠে, এই বক্তব্য পেশ করার সময় তিনি পরোক্ষভাবে বেকারদের ‘আরশোলা’ (ককরোচ) ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

শীর্ষ আদালতের সর্বোচ্চ আসনে বসে এমন মন্তব্যের পর দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ক্ষোভে ফেটে পড়েন আইনজীবী থেকে শুরু করে যুবসমাজের একাংশ। অনেকে গায়ে আরশোলার ছবি এঁটে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভও দেখান। যদিও প্রধান বিচারপতি পরে সাফাই দিয়ে জানান, এটি তাঁর একটি মৌখিক পর্যবেক্ষণ মাত্র এবং এর ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই বিতর্কের আগুন নেভার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নেয় এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্রের মস্তিষ্কপ্রসূত দল, স্বাগত জানালেন মহুয়া-কীর্তি

এই অভিনব ভার্চুয়াল দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে নামে এক যুবক, যিনি আমেরিকার বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবং অতীতে আম আদমি পার্টির (AAP) সোশ্যাল মিডিয়া টিমের সাথে যুক্ত ছিলেন।

দলটি তৈরি হতেই সমাজমাধ্যমে এটি নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়:

  • মহুয়া মৈত্র: কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র রসিকতা করে এই দলের সদস্য হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে লেখেন, এমনিতেই তাঁকে ‘দেশদ্রোহী পার্টির সদস্যতা’ দেওয়া হয়েছে। পাল্টা জবাবে CJP তাঁকে একজন ‘যোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে দলে স্বাগত জানায়।
  • কীর্তি আজাদ: তৃণমূলের প্রাক্তন ক্রিকেটার-সাংসদ কীর্তি আজাদ জানতে চান, এই দলে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা কী? CJP-র তরফে মজাদার জবাব আসে, “১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ (১৯৮০ উল্লেখ থাকলেও মূলত ‘৮৩) জয় করার যোগ্যতাই আপনার জন্য যথেষ্ট।”

CJP-র ৫ দফার ইস্তাহার ও যোগদানের ‘আজব’ শর্ত

নিজেদের সম্পূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক দল দাবি করলেও, দেশের সাম্প্রতিক একাধিক জ্বলন্ত ইস্যুকে সামনে রেখে ৫ দফার একটি চমৎকার ইস্তাহার প্রকাশ করেছে ককরোচ জনতা পার্টি:

১. সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিরা অবসরের পর কোনোভাবেই রাজ্যসভার সাংসদ হতে পারবেন না।

২. সংসদের মোট আসন সংখ্যা না বাড়িয়েই মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করতে হবে।

৩. দলবদলু বিধায়ক ও সাংসদেরা দল ছাড়লে অন্তত ২০ বছর আর কোনো নির্বাচনে লড়তে পারবেন না।

৪. সিবিএসই (CBSE) বোর্ডে পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নের নামে যথেচ্ছ টাকা নেওয়া বন্ধ করতে হবে।

৫. ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস বিতর্কে দেশজুড়ে ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

দলের সদস্য হওয়ার শর্ত: এই ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য হতে গেলে প্রার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে বেকার ও অলস হতে হবে। পাশাপাশি, সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং পেশাদারদের মতো ক্ষোভ উগরে দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। যুবসমাজ তথা ‘জেন-জি’ (Gen-Z) প্রজন্মকে টানতে শীঘ্রই তারা একটি বিশেষ সম্মেলন বা কনফারেন্সের ডাক দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে ২১০০-র বেশি রাজনৈতিক দল রয়েছে, যার মধ্যে ২০৪৯টি দল নথিভুক্ত হলেও স্বীকৃতিহীন। এই আবহে CJP কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে খাতাকলমে রাজনৈতিক দল হিসেবে নাম নথিভুক্ত করবে, নাকি এটি নিছকই একটি ডিজিটাল প্রতিবাদ বা সমাজমাধ্যমের হিড়িক হয়েই থেকে যাবে— তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত ছাব্বিশের রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝে এই ‘আরশোলা বাহিনী’ যে যুবসমাজের একাংশের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

Admin
  • Admin

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *