ট্রফি জয়ের মহাকাব্য নাকি আর্থিক কেলেঙ্কারির কালো মেঘ, কোন পরিচয়ে শেষ হচ্ছে গুয়ার্দিওলার ম্যান সিটি অধ্যায়?

ইংলিশ ফুটবলে প্রায় এক যুগের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির কোচের গদি ছাড়ছেন পেপ গুয়ার্দিওলা। তাঁর হাত ধরে ক্লাবটি পেয়েছে ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং তিনটি এফএ কাপের মতো মহিমান্বিত ট্রফি। কিন্তু এই অভূতপূর্ব সাফল্যের সমান্তরালে ক্লাবের গায়ে লেগেছে আর্থিক অনিয়মের এক বিশাল কলঙ্ক। গুয়ার্দিওলার বিদায়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাই আবারও ফুটবল বিশ্বে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে একটিই প্রশ্ন—ম্যান সিটির বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা ‘১১৫টি আর্থিক অভিযোগের’ ভবিষ্যৎ কী?
অভিযোগের বেড়াজালে নীল শিবির
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের এই বিস্ফোরক অভিযোগ আনে। মূল অভিযোগগুলোকে মূলত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, অন্তত ৫৪টি ক্ষেত্রে ক্লাব সঠিক আর্থিক তথ্য গোপন করেছে। দ্বিতীয়ত, ফুটবলার ও কোচদের প্রকৃত বেতন ও বোনাসের হিসাব আড়াল করা হয়েছে। এ ছাড়া উয়েফার ফিনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি) এবং প্রিমিয়ার লিগের প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রুলস (পিএসআর) ভাঙার পাশাপাশি তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে সিটির বিরুদ্ধে। সবচেয়ে গুরুতর দাবিটি হলো, ক্লাবটির মালিকপক্ষ নিয়মের তোয়াক্কা না করে স্পনসরশিপের নামে নিজস্ব অর্থ ক্লাবে ঢুকিয়েছে, যা বাইরে থেকে স্পনসরদের টাকা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। যদিও শুরু থেকেই সিটি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে।
দীর্ঘায়িত আইনি লড়াই ও অনিশ্চয়তা
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৮ সালে, যখন জার্মান সংবাদপত্র ‘ডার স্পিগেল’ ম্যান সিটির কিছু অভ্যন্তরীণ ইমেল ফাঁস করে। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত লন্ডনে এর আনুষ্ঠানিক শুনানি চলে। সিটির পক্ষে লড়ছেন ব্রিটেনের নামী আইনজীবী লর্ড প্যানিক। শুনানির পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার জটিলতার কারণে স্বাধীন প্যানেল এখনও চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করতে পারেনি। এমনকি রায় প্রকাশের পরও পরাজিত পক্ষের আপিল করার নিশ্চিত সুযোগ থাকায় এই আইনি যুদ্ধ সহজে থামছে না। এর আগে ২০২০ সালে উয়েফা সিটিকে দুই বছরের জন্য নির্বাসিত করলেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত (সিএএস) তা বাতিল করে। তবে প্রিমিয়ার লিগের নিজস্ব আইনি কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় এবার সিটির পার পেয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে। এই মামলায় ইতিমধ্যেই আবু ধাবির শাসক মহলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাবের মহম্মদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও জড়িয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও ট্রফির ভবিষ্যৎ
গুয়ার্দিওলা এমন এক সন্ধিক্ষণে ক্লাব ছাড়ছেন যখন ম্যান সিটির আকাশে আইনি অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে এনজো মারেস্কার মতো নাম উঠে আসলেও, নতুন কোচের জন্য পরিস্থিতি মোটেও সহজ হবে না। এই মামলার রায়ের ওপর নির্ভর করছে ম্যানচেস্টার সিটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বড় অঙ্কের পয়েন্ট কর্তন, অতীতের ট্রফি বাতিল, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তি হতে পারে ক্লাবটির। ফলে পেপ গুয়ার্দিওলা ট্রফি ও সাফল্যের পাহাড় চূড়ায় রেখে গেলেও, বিশাল এই আইনি কেলেঙ্কারি তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে চিরকাল এক বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখবে।