নোটিশ সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’, অভিষেকের পাশে দাঁড়িয়ে সুর বদল তৃণমূলের, দায় এড়ালেন মেয়র ফিরহাদ

নোটিশ সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’, অভিষেকের পাশে দাঁড়িয়ে সুর বদল তৃণমূলের, দায় এড়ালেন মেয়র ফিরহাদ

কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর অফিসে কলকাতা পুরসভার (KMC) ৭ দিনের ‘বুলডোজার’ হুঁশিয়ারি সম্বলিত নোটিশ টাঙানোর পর যে তীব্র রাজনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছিল, বুধবার রাতে তাতে এক নতুন ও নাটকীয় মোড় এলো। বিকেলে যে নোটিশ কাণ্ডকে ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে কার্যত হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন দলীয় নেতৃত্ব, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সরাসরি ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হলো, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো যাবতীয় নোটিশ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।

একদিকে দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের এই ‘অফিশিয়াল’ ডিফেন্স আর অন্যদিকে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ‘আমি কিছু জানি না’ বলে দায় এড়ানোর কৌশল— সব মিলিয়ে ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর ঘাসফুল শিবিরের অন্দরের চরম সমন্বয়হীনতা ও টানাপোড়েন আরও একবার আমজনতার সামনে চলে এলো।

অভিষেক মাথা নত করবেন না, এটা দলের অবস্থান: কুণাল ঘোষ

বুধবার বিকেলে যেখানে কুণাল ঘোষ বলেছিলেন, “কার কটা সম্পত্তি রয়েছে তা একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন”, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুর সম্পূর্ণ বদলে দলের তরফে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেন তিনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আইনি ও রাজনৈতিক রক্ষাকবচ দিয়ে কুণাল ঘোষ বলেন:

“অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো যাবতীয় নোটিশ সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক এবং ভিত্তিহীন। এটা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটাই এখন তৃণমূল কংগ্রেসের অফিশিয়াল অবস্থান। এর বাইরে দলের আর কিছু বলার সম্ভব নয়। আসলে রাজনৈতিকভাবে লড়তে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কয়েকজন তৃণমূল কংগ্রেস নেতাকে কালিমালিপ্ত করার একটা নোংরা চেষ্টা হচ্ছে। তবে আমরা স্পষ্ট করে দিতে চাই, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই সমস্ত এজেন্সির চমকানি-ধমকানি বা নোটিশের সামনে কোনোভাবেই মাথা নত করবেন না।”

নোটিশ বিল্ডিং বিভাগের, আমার জানার কথাই নয়! দায় এড়ালেন মেয়র

কুণাল ঘোষ যখন দলের অবস্থান স্পষ্ট করে আসরে নেমেছেন, ঠিক তখনই এই নোটিশ জারির নেপথ্যে থাকা কলকাতা পুরসভার প্রধান তথা মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বয়ান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যে পুরসভার আইনের ৪০১ ধারায় এই নোটিশ ঝুলিয়ে আসা হয়েছে, সেই পুরসভারই মেয়র হয়েও ফিরহাদ হাকিম কার্যত নজিরবিহীনভাবে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেয়র ফিরহাদ হাকিম দাবি করেন:

“এই নোটিশ কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের (Building Department)। নিয়ম অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় প্রশাসনিক স্তরেই এই কাজ হয়েছে। এ বিষয়ে মেয়রের আগে থেকে জানার কথাই নয়।”

মেয়রের এই ‘হাত ধুয়ে ফেলা’ মন্তব্য এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর দেবলীনা বিশ্বাসের আচমকা বরো চেয়ারপার্সনের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘটনাকে এক সুতোয় বাঁধছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, নতুন শুভেন্দু অধিকারী সরকারের কড়া প্রশাসনিক নজরদারির মুখে পুরসভার আইন মেনেই এই নোটিশ জারি হয়েছে, যা আটকানোর ক্ষমতা খোদ মেয়রেরও ছিল না। আর সেই কারণেই দলের ‘ডেপুটি’র বাড়িতে পুরসভার নোটিশ যাওয়া সত্ত্বেও, রাজনৈতিকভাবে এর দায় নিজের কাঁধে নিতে চাইছেন না ফিরহাদ।

বিকেলে ‘ব্যক্তিগত’, রাতে ‘দলীয়’— তৃণমূলের দ্বিচারিতাকে খোঁচা বিরোধীদের

একই দিনে তৃণমূলের দুই শীর্ষ নেতার দুই রকম অবস্থান এবং কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সুর বদলে ফেলা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। নতুন সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদের দাবি, একদিকে পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারি, অন্যদিকে সল্টলেক-কালীঘাটে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে পুরসভার বুলডোজার অ্যাকশন— এই জোড়া ফলায় তৃণমূলের অন্দরে এখন তাসের ঘরের মতো ভাঙন ধরেছে। দলের নেতারা একদিকে অভিষেককে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করছেন, আবার অন্যদিকে নিজেদের আইনি ঝামেলা থেকে দূরে রাখতে ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বা ‘আমি কিছু জানি না’ বলে পিঠ বাঁচানোর রাস্তা খুঁজছেন। এখন দেখার, এই নোটিশের ৭ দিনের ডেডলাইন শেষ হওয়ার পর পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ পরবর্তী কী আইনি পদক্ষেপ করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *