অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলা বা তথ্য ফাঁস নয়, আমলা ও পুলিশকর্তাদের জন্য নবান্নের চরম ‘সেন্সর’ গাইডলাইন

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার এক নজিরবিহীন ও চূড়ান্ত কড়া পদক্ষেপ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের (Department of Personnel and Administrative Reforms) তরফে রাজ্য সরকারি আধিকারিক ও কর্মচারীদের জন্য এক কঠোর নির্দেশিকা বা সার্কুলার জারি করা হয়েছে। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করা, ইন্টারভিউ দেওয়া, সরকারি গোপন নথি প্রকাশ করা কিংবা কোনো মিডিয়া টক-শো বা সামাজিক মাধ্যমে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো।
মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবালের সই করা এই মেগা নির্দেশিকা ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত সরকারি দফতর, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন এবং রাজ্য ও কলকাতা পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এই সার্কুলার যেন অবিলম্বে অধীনস্থ সমস্ত ছোট-বড় অফিসে কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়।
কেন এই জরুরি নিদান? নবান্নের অন্দরের খবর
নবান্ন সূত্রে খবর, ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছিল, বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারী ও আধিকারিকেরা সংবাদমাধ্যমে সরাসরি মুখ খুলছিলেন। শুধু তাই নয়, ফেসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যমেও প্রশাসনিক নীতি নিয়ে অনেকে ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করছিলেন এবং সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথি ও তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে লিক বা ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল। এই প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অভাব ও তোলপাড় করা তথ্য ফাঁস রুখতেই শুভেন্দু অধিকারী সরকারের এই ঝটিকা দাওয়াই।
আইএএস থেকে পুরকর্মী— কার কার ওপর কার্যকর হচ্ছে এই নিয়ম?
নবান্নের জারি করা এই নির্দেশিকার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। এর আওতায় আসছেন:
- উচ্চপদস্থ আইএএস (IAS), ডব্লিউবিসিএস (WBCS) এবং আইপিএস ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সার্ভিস (WBPS)-এর সমস্ত আধিকারিক।
- নবান্ন ও মহাকরণের সাধারণ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও জেল কর্মীবৃন্দ।
- রাজ্যের সমস্ত পুরসভা (Municipality), পুর নিগম (Corporation) এবং স্বশাসিত সংস্থার কর্মীরা।
- সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী এবং বিভিন্ন সরকারি বোর্ডের সদস্যরা।
বিজ্ঞপ্তির মূল পাঁচটি কড়া শর্ত: কী করা যাবে আর কী যাবে না?
১. মিডিয়া প্রোগ্রামে নিষেধাজ্ঞা: সরকারের লিখিত অনুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো টিভি চ্যানেল, ডিজিটাল মিডিয়া বা রেডিওর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি বেসরকারি বা স্পনসরড কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পারমিশন বাধ্যতামূলক।
২. তথ্য ও নথি ফাঁস নিষিদ্ধ: সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো সরকারি ফাইল, ক্যাবিনেট নোট, খসড়া বা প্রশাসনিক কাগজপত্র তুলে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।
৩. নিবন্ধ ও সম্পাদনা বন্ধ: অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মচারী খবরের কাগজ বা সাময়িকী-পত্রিকায় নিজস্ব কলাম বা লেখা লিখতে পারবেন না। কোনো পত্রিকা বা পোর্টাল সম্পাদনা বা পরিচালনার সাথেও যুক্ত থাকা যাবে না।
৪. সরকারের সমালোচনা নয়: কোনো সরকারি মঞ্চ বা ব্যক্তিগত স্তরে কেন্দ্র কিংবা রাজ্য সরকারের কোনো নীতি, বিল বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো বিরূপ মন্তব্য, সমালোচনা বা ক্ষোভ উগরে দেওয়া যাবে না।
৫. আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্পর্ক রক্ষা: কোনো কর্মচারী এমন কোনো বক্তব্য বা লেখা প্রকাশ করতে পারবেন না, যা কেন্দ্র-রাজ্য সুসম্পর্ক অথবা বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা সরাসরি দেশদ্রোহ ও কঠোর বিভাগীয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হবে।
শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা নাকি প্রশাসনিক অনুশাসন? তুঙ্গে বিতর্ক
নবান্নের এই মেগা ফরমান জারি হতেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও জল্পনা শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, এই কড়া নির্দেশিকার মাধ্যমে আসলে সরকারি কর্মচারীদের বাক-স্বাধীনতা এবং জনসমক্ষে মত প্রকাশের অধিকারকে পুরোপুরি খর্ব ও সীমাবদ্ধ করা হলো।
যদিও নবান্নের শীর্ষ মহলের স্পষ্ট দাবি, বিগত জমানায় যেভাবে সরকারি ফাইল ও ক্যাবিনেট বৈঠকের আলোচনা বাইরে চলে যেত, তাতে প্রশাসনিক গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছিল। নতুন ‘ডাবল ইঞ্জিন’ জমানায় সরকারি তথ্যের অপব্যবহার রুখতে এবং আমলাতন্ত্রের ভেতরে ১০০ শতাংশ পেশাদারিত্ব ও অনুশাসন বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার মতো হাই-প্রোফাইল সিদ্ধান্ত এবং কলকাতায় পাক চরের গ্রেফতারি নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু তুঙ্গে, ঠিক তখনই শুভেন্দুর এই ‘সেন্সরশিপ’ বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, নবান্নের রাশ এবার অত্যন্ত শক্ত হাতে পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো সরকারি কর্মী এই আচরণবিধি (Service Conduct Rules) লঙ্ঘন করলে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি সাসপেনশন বা বিভাগীয় মামলা রুজু করা হবে বলে সাফ জানানো হয়েছে।