মাদ্রাসায় ক্লাস শুরুর আগে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক, এবার শিক্ষা ক্ষেত্রে শুভেন্দু সরকারের মেগা ফরমান

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যখন শাসনব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে নতুন বিজেপি সরকার, ঠিক তখনই রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে সবথেকে বড় এবং অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিল নবান্ন। এবার পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মাদ্রাসায় প্রতিদিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে অ্যাসেম্বলি বা প্রার্থনার সময় বাধ্যতামূলকভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে হবে।
সোমবার (১৯শে মে) রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ডিরেক্টরেটের (Directorate of Madrasah Education) তরফে একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা জারি করে এই ঐতিহাসিক ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এই নির্দেশ অবিলম্বে এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কার্যকর করারও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পূর্বতন সমস্ত প্রথা বাতিল, উচ্চস্তরের প্রশাসনিক সম্মতিতে নয়া নিয়ম
মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের জারি করা এই নয়া নির্দেশিকায় পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, এতদিন ধরে চলে আসা পূর্বতন সমস্ত প্রচলিত নির্দেশ, নিয়ম বা প্রথাকে সম্পূর্ণ বাতিল ও খণ্ডন করে এই নয়া নিয়ম বলবৎ করা হলো। অর্থাৎ, এখন থেকে প্রতিদিন পঠনপাঠন শুরু করার আগে স্কুলের মূল প্রার্থনা সভায় ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গাওয়া সম্পূর্ণ আবশ্যিক।
সরকারি উচ্চপদস্থ সূত্রের খবর, এই নির্দেশিকাটি শিক্ষা দফতরের কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তথা খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সবুজ সংকেত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের পরেই এই মেগা সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
সরকারি থেকে বেসরকারি— কোন কোন মাদ্রাসায় কার্যকর হচ্ছে এই নিয়ম?
নবান্নের এই নয়া নির্দেশিকার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। রাজ্যের কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নিয়ম বাধ্যতামূলকভাবে পালন করতে হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- মডেল মাদ্রাসা: রাজ্যের সমস্ত সরকারি মডেল মাদ্রাসা (ইংরেজি মাধ্যম)।
- অনুমোদিত মাদ্রাসা: সরকার অনুমোদিত এবং সরকারি অনুদান বা সাহায্যপ্রাপ্ত (Aided) সমস্ত মাদ্রাসা।
- এমএসকে ও এসএসকে: রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ অনুমোদিত সমস্ত এমএসকে (MSK) এবং এসএসকে (SSK)।
- বেসরকারি মাদ্রাসা: সরকার স্বীকৃত রাজ্যের সমস্ত বেসরকারি মাদ্রাসা (Private Madrasah)।
মেরুকরণ নাকি জাতীয়তাবোধ? তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা
শুভেন্দু সরকারের এই নজিরবিহীন নির্দেশিকা সামনে আসার পরেই রাজ্যের শিক্ষা মহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অলিন্দে এক বিশাল বিতর্কের ঝড় উঠেছে। বাম ও বিদায়ী তৃণমূল শিবিরের একাংশের মতে, এই ধরণের সিদ্ধান্ত আসলে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় ও স্বশাসিত পরিমণ্ডলে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
যদিও নতুন শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, ‘বন্দে মাতরম’ কোনো ধর্মীয় স্লোগান নয়, এটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মূল মন্ত্র এবং জাতীয়তাবোধের প্রতীক। ছাত্রছাত্রীদের মনে শৈশব থেকেই দেশপ্রেম জাগ্রত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন আমলা ও পুলিশকর্তাদের মুখ বন্ধ করতে নবান্নের ‘সেন্সর’ গাইডলাইন জারি হয়েছে আর অন্যদিকে সল্টলেকের তৃণমূল কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দার তোলাবাজির দায়ে গ্রেফতার হয়েছেন, ঠিক তখনই মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার এই চাল অত্যন্ত মাস্টারস্ট্রোক। এর মাধ্যমে বিজেপি সরকার বুঝিয়ে দিল যে, শুধু প্রশাসনিক রাশ শক্ত করাই নয়, তাদের মূল আদর্শগত এজেন্ডাগুলিও তারা রাজ্যে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রূপায়ণ করতে চলেছে। এখন দেখার, এই নয়া সরকারি নির্দেশের পর গ্রাউন্ড স্তরে মাদ্রাসাগুলিতে এর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।