ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট: অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যছাড়া করতে কেন্দ্রের কী গাইডলাইন? জেনে নিন হোল্ডিং সেন্টারের নিয়মাবলী

ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট: অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যছাড়া করতে কেন্দ্রের কী গাইডলাইন? জেনে নিন হোল্ডিং সেন্টারের নিয়মাবলী

পশ্চিমবঙ্গে ছাব্বিশের ঐতিহাসিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর অনুপ্রবেশ সমস্যা সমাধানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মাঠে নেমেছে নতুন বিজেপি সরকার। বুধবার নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাজ্যে এবার থেকে সিএএ (CAA) আইনের পরিধির বাইরে থাকা সমস্ত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং ‘ডিপোর্ট’ বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এক বছর আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কড়া নির্দেশিকা সমস্ত রাজ্যকে পাঠিয়েছিল, যা বিগত তৃণমূল সরকার তোষণের রাজনীতি করতে গিয়ে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। এবার সেই গাইডলাইন মেনেই রাজ্যে ‘ডিটেক্ট (চিহ্নিত করা), ডিলিট (ভোটার বা নাগরিক তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়া) এবং ডিপোর্ট (ফেরত পাঠানো)’ বা ‘থ্রি-ডি’ নীতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সেই হাই-প্রোফাইল নির্দেশিকায় ঠিক কী বলা আছে এবং ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ডিটেনশন শিবির নিয়ে কী নিয়ম রয়েছে, আসুন তা বিশদে জেনে নেওয়া যাক:

কারা আইনের চোখে ‘অবৈধ অভিবাসী’?

কেন্দ্রের গাইডলাইন অনুযায়ী দুটি ক্যাটাগরির মানুষকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে:

১. যে সমস্ত বিদেশি নাগরিক কোনো রকম বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা আইনি নথিপত্র ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন।

২. যাঁরা বৈধ নথিপত্র নিয়ে ভারতে এসেছিলেন, কিন্তু ভিসার মেয়াদ বা নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও বেআইনিভাবে এ দেশে থেকে গিয়েছেন।

যেহেতু কেন্দ্রের নিজস্ব কোনো সিভিল পুলিশ বাহিনী নেই, তাই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা, গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশছাড়া করার সম্পূর্ণ আইনি ক্ষমতা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশের হাতেই দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তে ধরা পড়লে তৎক্ষণাৎ ফেরত: বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক

বাংলাদেশ বা মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে বা জলপথে অনুপ্রবেশের সময় কেউ ধরা পড়লে কেন্দ্রের নির্দেশিকা অত্যন্ত স্পষ্ট:

  • তৎক্ষণাৎ প্রত্যাবর্তন: বর্ডার চত্বরে ধরা পড়লে কোনো টালবাহানা না করে দ্রুত ওপার বাংলায় বা সংশ্লিষ্ট দেশে পুশব্যাক করতে হবে।
  • বায়োমেট্রিক ডেটাবেস: ফেরত পাঠানোর আগে বাধ্যতামূলকভাবে ওই অনুপ্রবেশকারীর আঙুলের ছাপ (Fingerprints) এবং মুখের ছবি-সহ সমস্ত ডেমোগ্রাফিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
  • কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড: এই সমস্ত তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘ফরেনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টাল’ (FIP)-এ আপলোড করতে হবে। ইন্টারনেট না থাকলে অফলাইনে তথ্য নিয়ে পরে দ্রুত তা পোর্টালে তুলতে হবে।

ধরা পড়ার পর কেউ ‘ভারতীয়’ দাবি করলে কী হবে?

রাজ্যের ভেতরে কোনো সন্দেহভাজন অবৈধ বসবাসকারী ধরা পড়লে জেলা স্তরের পুলিশ ও বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF)-কে দিয়ে তদন্ত করানো হবে।

  • ৩০ দিনের ডেডলাইন: ধৃত ব্যক্তি যদি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেন, তবে প্রশাসনকে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে তাঁর সমস্ত নথিপত্র ও দাবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা ভেরিফাই করতে হবে।
  • হোল্ডিং সেন্টারে আটক: এই তদন্ত চলাকালীন বা পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তিকে খোলা জায়গায় ছেড়ে দেওয়া হবে না। তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা স্তরের ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা শরণার্থী শিবিরে আটকে রাখা হবে। প্রমাণ মিললে তবেই মিলবে রেহাই, অন্যথায় সোজা সীমান্ত পার।

‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা শরণার্থী শিবির নিয়ে কেন্দ্রের কড়া গাইডলাইন

অনুপ্রবেশকারীদের আইনি হেফাজতে রাখার জন্য পরিকাঠামোগত স্তরে বেশ কিছু কড়া নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক:

  • জেলায় জেলায় শিবির: গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রত্যেকটি রাজ্য সরকারকে রাজ্যের সমস্ত জেলায় পর্যাপ্ত সংখ্যায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ (Holding Centers) বা শরণার্থী শিবির তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্দেহভাজন বা প্রমাণিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আটকে রাখা যাবে।
  • খরচ বহন: জেলা স্তরে এই সমস্ত হোল্ডিং সেন্টার বা ডিটেনশন শিবির তৈরি করার যাবতীয় প্রাথমিক খরচ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকেই বহন করতে হবে। তবে ধৃতদের আটক করা থেকে শুরু করে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত যে যাতায়াত বা প্রশাসনিক খরচ হবে, তা পরবর্তীকালে কেন্দ্র রাজ্যকে মিটিয়ে দেবে।

ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া ও ‘ব্ল্যাকলিস্ট’

তদন্তে কেউ রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি প্রমাণিত হলে আইনি নির্দেশের কাগজ বা ডিক্রি তৈরি করে তাঁকে কড়া পুলিশি পাহারায় বিএসএফ (বাংলাদেশ সীমান্তের জন্য) অথবা আসাম রাইফেল্‌স (মায়ানমার সীমান্তের জন্য)-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ওপার বাংলার বিজিবি-র সাথে ফ্ল্যাগ মিটিং করে তাঁদের সীমান্ত পার করে দেবে। এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের চিরতরে ভারতের জন্য ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ (Blacklisted) করে দেওয়া হবে।

আর কখনো তৈরি হবে না আধার বা ভোটার কার্ড

যাঁদের এ দেশ থেকে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা হচ্ছে, তাঁরা যাতে ভবিষ্যতে কোনো রকম জালিয়াতি করে এ দেশের নাগরিকত্ব বা সরকারি পরিচয়পত্র হাতিয়ে নিতে না পারেন, তার জন্য নিশ্ছিদ্র সুরক্ষার ব্যবস্থা করছে কেন্দ্র। ফেরত যাওয়া নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ও ব্যক্তিগত তথ্য সরাসরি নির্বাচন কমিশন, বিদেশ মন্ত্রক এবং ভারতের অনন্য সনাক্তকরণ কর্তৃপক্ষ (UIDAI)-এর কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠিয়ে ব্লক করে দেওয়া হবে। ফলে ওই আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন ভারতের কোনো পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হবে না।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন কলকাতা ও সল্টলেকে কাটমানি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিধাননগরের তৃণমূল কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দারের গ্রেফতারি এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে পুরসভার বুলডোজার নোটিশ জারি করে চরম রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হয়েছে, ঠিক তখনই নবান্নে বসে শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রের এই ‘থ্রি-ডি’ নীতি ও হোল্ডিং সেন্টারের ব্লুপ্রিন্ট রূপায়ণ শুরু করে দিলেন। বিগত সরকারের ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণে রাজ্যে যে অনুপ্রবেশের স্বর্গরাজ্য তৈরি হয়েছিল, এই কড়া গাইডলাইন চালুর ফলে তাতে যে একবারে স্থায়ী তালা পড়তে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *