ফলতার ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে ২০৮-এর লক্ষ্যে বিজেপি! ‘অভিষেক মডেলে’ ধস, ভাঙছে ডায়মন্ড হারবারের সাজানো দুর্গ

ফলতার ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে ২০৮-এর লক্ষ্যে বিজেপি! ‘অভিষেক মডেলে’ ধস, ভাঙছে ডায়মন্ড হারবারের সাজানো দুর্গ

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে বিদায়ী শাসক দলের অন্যতম প্রধান শক্তিপীঠ তথা ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র। তৃণমূলের রাজনৈতিক অলিন্দে যা একসময় দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, রবীন্দ্রকাব্যের উপমা টেনে দলের ভেতরের নেতারাই এখন তাকে ‘নকল বুঁদির গড়’ বলে উপহাস করতে শুরু করেছেন।

ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের হাই-প্রোফাইল পুনর্নির্বাচনের ঠিক মুখে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুগামী জাহাঙ্গির খান ভোটের ময়দান থেকে সম্পূর্ণ সরে দাঁড়ানোর (ওয়াক ওভার) ঘোষণা করায়, সেখানে গেরুয়া শিবিরের জয় এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের খতিয়ানে বিজেপির মোট আসন সংখ্যা একলাফে ২০৮-এ পৌঁছতে চলেছে।

কমিশনের খাতায় আসন ২০৮, শুভেন্দুর ভবানীপুর ধরে রাখার অঙ্কে কার্যক্ষেত্রে ২০৭

গত ৪ঠা মে রাজ্যের ২৯৩টি আসনের ভোটগণনায় (অনিয়মের অভিযোগে ফলতার ভোট বাতিল হওয়ায় সে দিন গণনা স্থগিত ছিল) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। এরপর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার ভবানীপুর আসনটি নিজের হেফাজতে রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

আইনি ও সাংবিধানিক নিয়ম মেনে ফলতা পুনর্নির্বাচনের ফলাফল সংযুক্ত হলে কমিশনের প্রকাশিত নথিতে বিজেপির আসন সংখ্যা হবে ২০৮। তবে নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদের হুমায়ুন কবিরের পদত্যাগে খালি হওয়া রেজিনগর কেন্দ্রে পরবর্তী সময়ে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তৃণমূলের ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গিরের পিছু হঠা: ‘গাছের মই’ কাড়লেন স্বয়ং অভিষেক?

তৃণমূলের অন্দরে জাহাঙ্গির খানকে ‘ফলতার পুষ্পা’ বলে ডাকা হতো, যাঁর সবুজ সংকেত ছাড়া এলাকায় গাছের পাতাও নড়ত না। মঙ্গলবার নিজের বাসভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি আচমকা ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। জাহাঙ্গির দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতা অঞ্চলের জন্য যে মেগা উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, তার স্বার্থেই তিনি ময়দান ছাড়ছেন।

তবে দলের অন্দরমহলের খবর সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজনৈতিক মহলের দাবি, পুনর্নির্বাচনের কঠিন পরিস্থিতিতে যখন বিজেপি পুরো শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েছে, তখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলের কোনো প্রথম সারির নেতাকেই ফলতায় প্রচারে দেখা যায়নি। এমনকি ইস্তফা দেওয়ার আগে জাহাঙ্গির বহুবার ভাইপোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ওপার থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। রাজ্য জুড়ে পুলিশের দুর্নীতিবিরোধী ধরপাকড় এবং ‘টিম জাহাঙ্গির’-এর ওপর তৈরি হওয়া আইনি চাপই এই আত্মসমর্পণের মূল কারণ।

বিপন্নের মুখে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’, খসে পড়ছে হীরককণা

২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর ওপর ভর করে একের পর এক পঞ্চায়েত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল জোড়াফুল এবং ২০২৪-এর লোকসভায় অভিষেক রেকর্ড ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোটে জিতেছিলেন, ছাব্বিশের ঝড়ে তা এখন সম্পূর্ণ খাদের কিনারায়।

  • সাতগাছিয়ায় পদ্ম জয়: ডায়মন্ড হারবার লোকসভার অন্তর্গত সাতগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রে ইতিমধ্যেই গোহারা হেরেছে তৃণমূল, ফুটেছে পদ্ম।
  • বিষ্ণুপুরের বিধায়ক পলাতক: জেতার পরেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। পুলিশি মামলা এড়াতে তিনি গা ঢাকা দেওয়ায়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁর পুত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
  • ডায়মন্ড হারবারে ‘সৌজন্যের রাজনীতি’: সবথেকে বড় চমক দেখিয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল বিধায়ক পান্নালাল হালদার। গত শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেখানে প্রশাসনিক বৈঠক করতে গেলে, দু’বারের এই তৃণমূল বিধায়ক হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। ২০১৯ সালে এই ডায়মন্ড হারবারেই জেপি নড্ডার কনভয়ে পাথরবৃষ্টির ইতিহাসের পর, পান্নালালের এই ভোলবদল আসলে দলবদলেরই আগাম ইঙ্গিত।

পিসি-ভাইপোর দ্বন্দ্বে এবার কাঠগড়ায় অভিষেক, কালীঘাটে নজিরবিহীন তলব

জাহাঙ্গিরের এই আকস্মিক পতনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার তৃণমূল বিধায়কদের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। বিধায়ক কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহারা সরাসরি মমতার সামনেই অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গিরকে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ বলে কটাক্ষ করেন এবং অভিষেকের একক খবরদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তৃণমূলের দেড় দশকের ইতিহাসে যা কার্যত নজিরবিহীন, সেই ধারা বজায় রেখে বুধবারই ওই তিন বিধায়ককে কালীঘাটের বাড়িতে ডেকে জরুরি বৈঠক করেছেন মমতা ও অভিষেক। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত ১২ বছর ধরে পুলিশের প্রচ্ছন্ন মদত এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ডায়মন্ড হারবারে যে ক্ষমতার সৌধ গড়ে তোলা হয়েছিল, নবান্নে শুভেন্দু অধিকারী বসতেই সেই পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপের পরিবর্তনের হাওয়ায় এবার অভিষেকের সাজানো দুর্গও তাসের ঘরের মতো ধসে যাওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *