রোজ ৪ লাখ ব্যারেল জোগান ঘাটতি, চরম সংকটের মুখে দেশের এলপিজি বাজার!

রোজ ৪ লাখ ব্যারেল জোগান ঘাটতি, চরম সংকটের মুখে দেশের এলপিজি বাজার!

পশ্চিম এশিয়ার চলমান উত্তেজনা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতেও। এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম দু’বার বাড়ানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি (LPG) সরবরাহ নিয়ে। একটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এলপিজি ভোক্তা দেশ ভারত বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪ লক্ষ ব্যারেল সরবরাহ ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। নিক্কেই এশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে যখন হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ চালু ছিল, তখন ভারতে দৈনিক এলপিজি আমদানি ছিল ৮,৫১,৮৭০ ব্যারেল। অথচ, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এপ্রিল মাসে তা নজিরবিহীনভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩,৭৭,৬২০ ব্যারেলে।

বিকল্প উৎসের সন্ধান ও দূরত্বের চ্যালেঞ্জ

ভারত তার মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমদানি করে, যার ৮০ শতাংশই আসে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কাতার, কুয়েত এবং সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বর্তমান সংকটের কারণে ভারত বাধ্য হয়ে ইরান, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও চিলির মতো বিকল্প দেশগুলো থেকে এলপিজি কেনা শুরু করেছে। এপ্রিল মাসে এই দেশগুলো থেকে দৈনিক ৪৩,০০০ ব্যারেল গ্যাস এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল শূন্য। এছাড়া আমেরিকা ও আর্জেন্টিনা সহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকে এপ্রিলে দৈনিক ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ব্যারেল গ্যাস এলেও তা মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি মেটাতে অপর্যাপ্ত। পাশাপাশি, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে সরবরাহ পৌঁছাতে প্রায় ২০ দিন এবং আর্জেন্টিনা বা আমেরিকা থেকে আসতে ৩৫-৪৫ দিন সময় লেগে যাচ্ছে, যা সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

সরকারি কড়াকড়ি ও গ্রাহকদের ওপর প্রভাব

দেশে এলপিজি-র কোনো দীর্ঘমেয়াদী মজুত ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক রাখতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে, সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে “এক পরিবার, এক সংযোগ” নিয়ম কঠোরভাবে চালু করা হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরিবারে পাইপলাইন গ্যাস (PNG) সংযোগ থাকলে তারা আর ভর্তুকিযুক্ত গার্হস্থ্য এলপিজি সিলিন্ডার রাখতে পারবেন না। এই ধরনের পরিবারগুলোকে আগামী ৩ মাসের মধ্যে তাদের এলপিজি সংযোগ সমর্পণ বা বন্ধ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই সংকটের জেরে গত মার্চের শুরুতে ১৪.২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে দেশে ৪৫ দিনের এলপিজি রোলিং স্টক এবং ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত থাকলেও, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের পকেটে আরও বড় কোপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *