বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকবে তীব্র দাহদাহ, বিশ্বের ১৯টি সমুদ্রে ‘চিরস্থায়ী’ তাপপ্রবাহের চরম সতর্কতা বিজ্ঞানীদের

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে পৃথিবীর জলাশয়গুলির উষ্ণ-শীতল চক্রে এবার বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের অন্তত ১৯টি সমুদ্রে চিরস্থায়ী তাপপ্রবাহের মারাত্মক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ওই সমস্ত সমুদ্রের জলভাগ বছরের বেশিরভাগ সময় জুড়েই উত্তপ্ত থাকবে এবং স্বাভাবিক নিয়মে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। ওয়ানিমুন্ডের ‘লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর বাল্টিক সি রিসার্চ’-এর সমুদ্রবিশেষজ্ঞ ম্যাথিয়াস গ্রোগারের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল এই গবেষণাটি চালিয়েছেন। গবেষণার এই উদ্বেগজনক ফলাফলটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ‘কমিউনিকেশন্স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ পত্রিকায়।
রুদ্ধশ্বাস জলভাগ ও ভৌগোলিক ফাঁদ
বিজ্ঞানীরা ভূমধ্যসাগর, বাল্টিক সাগর, মেক্সিকো উপসাগর এবং লোহিত সাগরের মতো স্থলবেষ্টিত সমুদ্রগুলির পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেছেন। ভৌগোলিক গঠনের কারণে এই সমুদ্রগুলি উন্মুক্ত মহাসাগরের তুলনায় আকারে ছোট এবং অগভীর। চারপাশ স্থলভাগ দিয়ে ঘেরা হওয়ায় সমুদ্রের স্রোতে তাপ একদফা প্রবেশ করলে তা আর বের হওয়ার বা ছড়িয়ে পড়ার পথ পায় না। ফলস্বরূপ, জলভাগে তাপ চিরতরে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সাধারণত সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে টানা পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু এই নতুন জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, কিছু কিছু সমুদ্রে বছরে প্রায় ৩৩০ দিন পর্যন্ত তাপপ্রবাহ চলতে পারে, যা কোনো সাময়িক বিপর্যয় নয় বরং আবহাওয়ার একটি নতুন স্থায়ী ও বিপজ্জনক রূপ।
শিল্পের আগ্রাসন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব
সমুদ্রের এই অভূতপূর্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত বিশ্ব উষ্ণায়ন ও শিল্প দূষণ। কলকারখানা থেকে নির্গত প্রচুর পরিমাণ দূষিত জলকণা বা এরোসল বাতাসের পাশাপাশি জলভাগকেও মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। ২০০০ সালের পর থেকে এই দূষণের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পূর্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র এবং জ্বালানি তেল থেকে নির্গত সালফেটের দূষণ সূর্যালোককে প্রতিফলিত করে সমুদ্রের ওপর এক ধরনের ছায়া তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বায়ুমণ্ডল কিছুটা দূষণমুক্ত হতেই সেই ছায়া সরে যায় এবং আবদ্ধ সমুদ্রগুলি দ্রুত উত্তপ্ত হতে শুরু করে। বর্তমানে দূষণের হার যদি আর না-ও বাড়ে, তবুও ২১০০ সালের মধ্যে ১৯টির মধ্যে অন্তত ১৫টি সমুদ্রই এমন স্থায়ী তাপপ্রবাহের কবলে পড়বে।
ধ্বংসের মুখে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র
এই চিরস্থায়ী তাপপ্রবাহের ফলে আগামী ৩০ বছরে লোহিত সাগর বা তাইল্যান্ড উপসাগরের মতো অঞ্চলে উষ্ণায়নের প্রবণতা পূর্বাভাসের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বৃদ্ধি পাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রকৃতির ওপর। বিজ্ঞানীদের মতে, চলতি শতকের শেষে এই সমুদ্রগুলির তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যাবে যে সামুদ্রিক অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হলেও পূর্ব ভূমধ্যসাগর কিংবা হাডসন উপসাগরের মতো এলাকাগুলিকে এই চরম বিপর্যয় থেকে বাঁচানো কঠিন হবে। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের ব্যারেন্টস সমুদ্র, কারা সমুদ্র ও ল্যাপটেভ সমুদ্রের তাপমাত্রা বিশ্বের গড় বৃদ্ধির চেয়ে চার গুণ দ্রুত বাড়ছে। সামুদ্রিক এই চিরস্থায়ী বিপর্যয় ঠেকাতে এখনই বিশ্বব্যাপী কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত মহামারি নেমে আসবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।