যে অপারেশন থিয়েটার ছিল ইতিহাস, ৪৮ বছর পর সেখানেই শোনা গেল নবজাতকের কান্না!

যে অপারেশন থিয়েটার ছিল ইতিহাস, ৪৮ বছর পর সেখানেই শোনা গেল নবজাতকের কান্না!

দীর্ঘ প্রায় ৪৮ বছর পর একবিংশ শতকের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝে যেন ফিরে এল এক রূপকথা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার আলো জ্বলল অপারেশন থিয়েটারে, যার সাক্ষী থাকল হাওড়ার মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথি কলেজ হাসপাতাল। পরিকাঠামোগত অভাব এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধাকে জয় করে এক প্রসূতির সফল প্রসব করিয়ে নজির গড়লেন কলেজের চিকিৎসকেরা।

টোটোতেই প্রসব এবং চিকিৎসকদের তৎপরতা

মঙ্গলবার বিকেলে হাওড়া ডুমুরজলা এলাকার বাসিন্দা রিয়া গিরি নামে এক প্রসূতির তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হয়। স্বামী গোপাল গিরি পেশায় টোটোচালক, তিনি স্ত্রীকে হাওড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে ওঠে। বাধ্য হয়েই তিনি স্ত্রীকে মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. বিমান রায় এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, শিশুর মাথা ইতিমধ্যেই বাইরে চলে এসেছে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, কাপড়ের আড়াল তৈরি করে টোটোর ভেতরেই সফলভাবে প্রসব করানো হয়। পরে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়ে গিয়ে প্লাসেন্টা বের করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সদ্যোজাত পুত্র সন্তানের ওজন ২ কেজি ৯০০ গ্রাম এবং মা ও শিশু উভয়েই বর্তমানে সুস্থ আছেন।

পরিকাঠামোর অভাব ও বিকল্প চিকিৎসা

এই জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সীমিত পরিকাঠামোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রসবের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে যেখানে অ্যালোপ্যাথিক ‘অক্সিটোসিন’ ইনজেকশন দেওয়া বাধ্যতামূলক, সেখানে হাসপাতালে তা মজুত ছিল না। তবে চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প হিসেবে হোমিওপ্যাথি ওষুধ ‘আর্নিকা’ প্রয়োগ করেন। আধুনিক গাইনিকোলজিক্যাল লেবার রুম সেট-আপ না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও দক্ষতার কারণে বড়সড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন মা ও সন্তান।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও ভবিষ্যতের আশা

১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী হোমিওপ্যাথি কলেজে শেষবার ১৯৭৮ সালে স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়েছিল। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর আবার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল। আশির দশকের শুরুতে যেখানে প্রতিদিন ১০-১২টি স্বাভাবিক প্রসব হতো, তা পরবর্তীতে সরকারি সদিচ্ছার অভাব এবং আধুনিক চিকিৎসা লবির চাপে বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের অধ্যক্ষ ডা. হিমাংশু হাইত এই ঘটনাকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, উপযুক্ত প্রতিভা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কেবল পরিকাঠামোর অভাবে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকেরা পিছিয়ে পড়ছেন। এই ঘটনা আগামী দিনে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *