ব্রেন ওয়েভেই মিলবে মানসিক চাপের হদিস, আইআইটি কানপুরের অভিনব গবেষণা!

ব্রেন ওয়েভেই মিলবে মানসিক চাপের হদিস, আইআইটি কানপুরের অভিনব গবেষণা!

আজকের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস মানুষের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই স্ট্রেস কার শরীরে কতটা প্রভাব ফেলছে এবং মানুষের কাজের ক্ষমতা কতটা কেড়ে নিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা এতদিন বেশ কঠিন ছিল। এই কঠিন কাজটিকেই সহজ করতে চলেছেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি কানপুরের গবেষকেরা। মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা ‘ব্রেন ওয়েভ’ বিশ্লেষণ করে মানসিক চাপের ব্লু-প্রিন্ট তৈরির এক অত্যন্ত আধুনিক গবেষণা শুরু করেছেন তাঁরা। চিকিৎসকদের মতে, এই গবেষণা আগামী দিনে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লব এনে দিতে পারে।

আইআইটি কানপুরের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তুষার সন্ধান এই প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গবেষকদের মূল লক্ষ্য হলো, ভিন্ন ভিন্ন মানুষ মানসিক চাপে কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখান এবং স্ট্রেস মানুষের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে (কগনিটিভ ফাংশন) কীভাবে প্রভাবিত করে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা। বিশেষ করে মানুষের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার ওপর স্ট্রেসের প্রভাব খতিয়ে দেখছেন তাঁরা।

আলফা তরঙ্গের গতিবিধি ও মস্তিষ্কের ভারসাম্য

এই গবেষণার মূল ভিত্তি হলো মস্তিষ্কের ‘আলফা তরঙ্গ’, যা মানুষের শান্ত ও শিথিল অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। গবেষকেরা মূলত নজর রাখছেন মস্তিষ্কের ‘ফ্রন্টাল লোব’ বা কপালের ঠিক পেছনের অংশের ওপর, যা মানুষের বিচারবুদ্ধি ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। ইইজি (EEG) প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁরা দেখছেন কীভাবে মানসিক চাপ মানুষের মনে এক ধরণের অসহায়তা বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় তৈরি করে।

গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ‘ফ্রন্টাল আলফা সিমেট্রি’। এটি এমন এক ধরণের বায়োমার্কার, যা মস্তিষ্কের ডান ও বাম গোলার্ধের আলফা তরঙ্গের ভারসাম্যের অভাবকে নির্দেশ করে। অবসাদ বা ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বাম ফ্রন্টাল অংশে আলফা তরঙ্গের শক্তি বেশি থাকে, যার অর্থ সেখানে কার্যকারিতা কম। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের কর্মোদ্দীপনার ওপর, অর্থাৎ মানুষ কোনো কাজের দিকে এগিয়ে যাবে নাকি ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাবে, তা এই তরঙ্গ দেখেই বোঝা সম্ভব।

কানপুরের বিজ্ঞানীদের নিজস্ব প্রযুক্তি ও আফেক্টিভ কম্পিউটিং

মানসিক চাপ ও মানুষের আবেগ সঠিকভাবে চেনার জন্য আইআইটি কানপুরের টিম সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ‘বায়োঅ্যাম্প্লিফায়ার’ ব্যবহার করছে। এতে রয়েছে নরম, নমনীয় সিলিকন ইলেকট্রোডযুক্ত ইইজি ডিভাইস এবং একটি কাস্টমাইজড থ্রি-ডি প্রিন্টেড আরামদায়ক হেডব্যান্ড। এর পাশাপাশি রোগীর হৃদস্পন্দন ট্র্যাক করার জন্য স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষকেরা এর আগে ‘DAAFNet’ নামের একটি বিশেষ অ্যালগরিদম তৈরি করেছিলেন, যা ইইজি ডেটা বিশ্লেষণ করে মানুষের আবেগ চিনতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই বিশেষ ক্ষেত্রটিকে বলা হয় ‘আফেক্টিভ কম্পিউটিং’, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মনোবিজ্ঞান এবং কগনিটিভ সায়েন্সকে একসাথে কাজে লাগানো হয়। এই প্রযুক্তি আগামী দিনে ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ (BCI)-এর মাধ্যমে মানুষের মনের ইচ্ছাকে সরাসরি মেশিনের কাজে রূপান্তর করতে সাহায্য করবে, যা কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে আলফা তরঙ্গ নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা হলেও, এটিকে স্ট্রেসের একটি চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য বায়োমার্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এখন গবেষকদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *