কলকাতায় জুতো ব্যবসার আড়ালে পাক গুপ্তচরবৃত্তি, এনআইএ-র জালে মূল পান্ডা জাফর

খাস কলকাতা থেকে পাক গুপ্তচরবৃত্তির এক আন্তর্জাতিক চক্রের পর্দাফাঁস করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। কলকাতার এন্টালি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে জাফর রিয়াজ নামের এক ব্যবসায়ীকে, যে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সামরিক গোপন তথ্য পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর হাতে তুলে দিচ্ছিল। আপাতদৃষ্টিতে জুতোর ব্যবসায়ী হলেও তার আসল কাজ ছিল ভারতীয় জওয়ানদের প্রেমের ফাঁদে বা ‘হানি ট্র্যাপ’-এ ফেলে দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন করা।
ব্যবসায় মন্দা থেকে দেশদ্রোহিতার পথ
তদন্তে জানা গিয়েছে, লাহোরের বাসিন্দা রাবিয়া জাফফার নামে এক মহিলার সঙ্গে বিয়ের পর ২০১২ সাল পর্যন্ত জাফর কলকাতাতেই বসবাস করত। কিন্তু একটি পথ দুর্ঘটনার পর তার জুতো ব্যবসায় চরম ক্ষতি হলে শুরু হয় তীব্র আর্থিক অনটন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে স্ত্রীকে পাকিস্তানের লাহোরে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় এবং নিজে নিয়মিত পাকিস্তানে যাতায়াত শুরু করে। একপর্যায়ে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নেওয়ার চেষ্টাও করছিল সে। জাফরের এই চরম আর্থিক অনটন ও অসহায়তার সুযোগ নিয়েই পাক গুপ্তচর সংস্থা তাকে বড় অঙ্কের টাকার টোপ দেয়, যার জেরে সে ভারতের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অন্ধকার পথে পা বাড়ায়।
জওয়ানদের ফাঁদে ফেলতে হানি ট্র্যাপের ছক
আর্থিক টোপ গিলে জাফর ভারতের বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর দফতর, সেনা ছাউনি এবং জওয়ানদের গতিবিধির ছবি ও ভিডিও তুলে সরাসরি আইএসআই-এর হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠাতে শুরু করে। তবে তার সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজটি ছিল বেনামে ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ করা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভুয়া নামে সিম কার্ড তুলে সেগুলির ওটিপি (OTP) সে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিত। পাক গুপ্তচররা সেই ভারতীয় নম্বরগুলি ব্যবহার করে সুন্দরী মেয়েদের নাম ও ভুয়া ছবি দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলত। এরপর সেই প্রোফাইল থেকে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলা হতো, যাতে তাঁদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া যায়।
প্রতিরক্ষায় বড়সড় প্রভাবের আশঙ্কা
কলকাতা থেকে নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে দিল্লিতে এবং পরবর্তীতে পাঞ্জাবে আস্তানা গেড়েছিল জাফর। তবে ২০২২ সালে পাঞ্জাব রাজ্যের ‘স্পেশাল অপারেশন সেল’ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে জাফর এবং তার সহযোগী বিহারের বাসিন্দা মহম্মদ শামশেদকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে এনআইএ এই চক্রের মূল শিকড় সন্ধানে নেমেছে। এই ঘটনার ফলে ভারতের সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা ও তথ্য গোপনীয়তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ধৃতদের দেওয়া ভারতীয় সিম ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই কতজন জওয়ান এই হানি ট্র্যাপের শিকার হয়েছেন এবং কতখানি সংবেদনশীল তথ্য সীমান্ত পার হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।