মিথ্যে বলব না! অভিষেকের নোটিশ বিতর্কে মেয়রের বিস্ফোরক মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

মিথ্যে বলব না! অভিষেকের নোটিশ বিতর্কে মেয়রের বিস্ফোরক মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) নোটিশ পাঠানোকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। একদিকে দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক ক্ষমতা ও গুরুত্ব, অন্যদিকে পুরসভার প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা— এই দুইয়ের টানাপোড়েনে মেয়রের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মেয়রের প্রকাশ্য বিব্রত ভাব এবং দায় এড়ানোর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পলিসি মেকার ও এক্সিকিউটিভ তত্ত্বের অবতারণা

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি তিনি আগে থেকে জানতেন কিনা, সংবাদমাধ্যমের এমন প্রশ্নের উত্তরে ফিরহাদ হাকিম স্পষ্ট জানান যে, তিনি বিষয়টি জানতেন না এবং এটি তাঁর জানার কথাও নয়। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে মেয়র প্রশাসন ও নীতি-নির্ধারকদের কাজের ফারাক বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দু’টি দিক থাকে— ‘পলিসি মেকার’ (নীতি-নির্ধারক) এবং ‘এক্সিকিউটিভ পাওয়ার’ (কার্যনির্বাহী ক্ষমতা)। মেয়র ও মেয়র পারিষদরা মূলত নীতি তৈরি করেন, আর পুরকমিশনারের আওতায় থাকা কর্মীরা দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন। রাজ্যের অর্থ দপ্তরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর পক্ষে যেমন জানা সম্ভব নয় কে জিএসটি দিচ্ছে আর কে দিচ্ছে না, তেমনই এই ক্ষেত্রটিও সম্পূর্ণভাবে একটি এক্সিকিউটিভ ক্ষমতা, যার সঙ্গে মেয়রের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

সুর বদল ও আইনি ব্যাখ্যার নেপথ্যে

এর আগে শহরের বেআইনি নির্মাণ রুখতে ফিরহাদ হাকিমকে একাধিকবার অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এমনকি বেআইনি নির্মাণ দেখলে নিজে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এবার যখন দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের সম্পত্তি নিয়ে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ উঠল এবং পুরসভা নোটিশ পাঠাল, তখন মেয়রের গলায় কিছুটা রক্ষণাত্মক ও ভিন্ন সুর শোনা গেল। “আইন আইনের পথে চলবে” বললেও তিনি মন্তব্য করেন যে, নোটিশ যাওয়া মানেই সেটি বেআইনি নির্মাণ নয়। অভিযোগ আর প্রমাণের মধ্যে তফাৎ রয়েছে এবং নোটিশের অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষকে এখন বৈধ নথি প্রদর্শন করতে হবে। মেয়রের এই নরম সুরকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিষেকের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন হিসেবেই দেখছেন।

রাজনৈতিক চাপ ও সম্ভাব্য প্রভাব

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ উঠলে যেখানে পুরসভা দ্রুত ভাঙার নোটিশ দেয় বা ব্যবস্থা নেয়, সেখানে হাই-প্রোফাইল নেতার ক্ষেত্রে মেয়রের এই ‘নথি যাচাই’-এর যুক্তি নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী শিবির। বিজেপি এবং সিপিআইএম-এর দাবি, দলের অন্দরে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে এবং অভিষেককে আড়াল করতেই মেয়র এখন দায় এড়াতে ‘এক্সিকিউটিভ’ ও ‘পলিসি মেকার’-এর তত্ত্ব খাড়া করছেন। সব মিলিয়ে এই নোটিশ বিতর্ক এবং মেয়রের সাফাইয়ের জেরে কলকাতার পুর-প্রশাসন যে বর্তমানে বেশ চাপের মুখে, তা স্পষ্ট। আগামী দিনে এই নোটিশের জবাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং এই বিতর্কের জল কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *