হজের আগে ট্রাম্পের আকস্মিক ভোলবদল, যুদ্ধ এড়াতে আরব বিশ্বের গোপন কূটনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে যখন সামরিক উত্তেজনার পারদ ক্রমাগত বাড়ছিল, ঠিক তখনই আমেরিকা ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে। কিছুদিন আগেও ইরানের উপর মার্কিন সামরিক অভিযানের জল্পনা যেখানে তুঙ্গে ছিল, সেখানে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে গিয়ে দুই দেশের মধ্যে পরমাণু চুক্তি নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একেবারে শেষ মুহূর্তে ইরানের উপর সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত বাতিল করে কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক ভোলবদলের নেপথ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) এবং কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও জোরালো চাপ কাজ করেছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
হজের পবিত্রতা রক্ষা ও পাল্টা হামলার আশঙ্কা
মূলত ২৪ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া পবিত্র হজ যাত্রাকে কেন্দ্র করেই এই যুদ্ধংদেহী অবস্থান থেকে পিছু হটেছে আমেরিকা। সৌদি আরব ও ইউএই মার্কিন প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে, হজের মতো পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মুসলিম পুণ্যার্থী সৌদি আরবে সমবেত হন। এই সংবেদনশীল সময়ে যুদ্ধ শুরু হলে তা মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার ভাবমূর্তি চিরতরে ক্ষুণ্ণ করবে। পাশাপাশি, গত কয়েক বছরে ইরান নিজের মিসাইল ও ড্রোন ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছিল। রিয়াদ ও আবু ধাবির আশঙ্কা ছিল, মার্কিন হামলার জবাবে ইরান যদি পাল্টা আঘাত হানে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও শহরগুলো সরাসরি ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়বে। নিজেদের অর্থনীতি ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আরব বিশ্ব ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়।
অস্থায়ী পরমাণু চুক্তি ও ইরানের অবস্থান
যুদ্ধ এড়াতে আমেরিকার পক্ষ থেকে এখন হজের আগেই একটি অস্থায়ী পরমাণু চুক্তি বা প্রাথমিক বোঝাপড়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কাতার, যারা ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনের একটি মেমোর্যান্ডাম তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিক এই চুক্তি সফল হলে হজের পর দুই দেশ বিস্তারিত আলোচনায় বসবে। তবে এই সমঝোতার পথে এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই দেশের বাইরে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাঠাতে সম্পূর্ণ নারাজ। তেহরানের যুক্তি, ইউরেনিয়াম হাতছাড়া করলে তারা কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে, যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে রমজান ও ঈদের সময়জুড়ে ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব এবং হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের কৌশলগত আধিপত্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। এমন পরিস্থিতিতে হজের আগে এই সম্ভাব্য চুক্তি যদি আলোর মুখ দেখে, তবে তা সাময়িকভাবে হলেও গোটা অঞ্চলের জন্য বড় স্বস্তির কারণ হবে। আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় তেহরানের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ব মহল।