জনশূন্য পাড়া আর পরিত্যক্ত ভিটে, জাপানের ‘আকিয়া’ সংকটের নেপথ্যে আসল সত্য কী!

জাপানের শহরতলি কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ চোখ আটকে যেতে পারে সারিবদ্ধ জনমানবহীন বাড়ির দিকে। বছরের পর বছর ধরে বন্ধ জানালা, দেওয়ালে জংধরা লতাগুল্মের আস্তরণ আর খসে পড়া চুন-সুড়কি দেখে অনেকেই এগুলোকে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই নিয়ে চলছে নানা জল্পনা। তবে রহস্যময় এই পরিস্থিতির নেপথ্যে কোনো অলৌকিক ঘটনা নেই, বরং লুকিয়ে আছে দেশটির গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
জাপান সরকারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৯০ লক্ষ বাড়ি সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে রয়েছে, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আকিয়া’ বা পরিত্যক্ত বাড়ি। ২০২৩ সালের হাউজিং সার্ভে বলছে, জাপানের মোট বাসস্থানের প্রায় ১৩.৮ শতাংশই এখন জনশূন্য, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
জটিল করনীতি ও ভাঙার বিপুল খরচ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ জাপানের বর্তমান ভূমি কর ব্যবস্থা। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জমিতে বসতবাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলে খালি জমির তুলনায় করের পরিমাণ প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। ফলে জরাজীর্ণ বাড়িটি ভেঙে ফেললে মালিকদের আকস্মিক মোটা অঙ্কের কর গুণতে হয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে বাড়ি ভাঙার উচ্চ ব্যয়। জাপানে একটি সাধারণ কাঠের বাড়ি ভাঙতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ ইয়েন খরচ হয়। যে বাড়ির বাজারমূল্য প্রায় শূন্য, তা ভাঙার জন্য এই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে চান না অনেক মালিক। ফলে লোকসান এড়াতে বাড়িটি অবহেলায় ফেলে রাখাই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
উত্তরাধিকারের বেড়াজাল ও জনসংখ্যা বিপর্যয়
‘আকিয়া’ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো মালিকানা ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি জটিলতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মালিকানা হস্তান্তরের ফলে অনেক সময় একটি বাড়ির অংশীদার হয়ে পড়েন বহু মানুষ, যারা হয়তো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বা বিদেশে ছড়িয়ে আছেন। জাজল আইন অনুযায়ী, সব অংশীদারের সম্মতি ছাড়া বাড়ি বিক্রি বা ভাঙা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক নথিপত্র না থাকায় তৈরি হচ্ছে ‘ফ্রোজেন ওনারশিপ’ বা স্থবির মালিকানা।
দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকায় এই বাড়িগুলো সংস্কারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে এই আবাসন সংকটের মূল শিকড়টি রয়েছে জাপানের জনমিতির গভীরে। দেশটিতে ক্রমাগত জন্মহার কমছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে জাপানে ১৫ লক্ষ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেখানে শিশু জন্মেছে মাত্র ৭ লক্ষ ৫০ হাজার। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের খোঁজে শহরমুখী হওয়া এবং তীব্র জনসংখ্যা হ্রাসের এই প্রবণতাই মূলত জাপানের বহু অঞ্চলকে ধীরে ধীরে নীরব ও জনশূন্য করে তুলছে।