ভুয়ো কাস্ট সার্টিফিকেটে চাকরি পেলে বরখাস্ত! আধিকারিকদেরও সিআইডি তদন্তের খাঁড়া, হুঁশিয়ারি মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর

ভুয়ো কাস্ট সার্টিফিকেটে চাকরি পেলে বরখাস্ত! আধিকারিকদেরও সিআইডি তদন্তের খাঁড়া, হুঁশিয়ারি মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর

দক্ষিণ দমদমে দাপুটে তৃণমূল কাউন্সিলর টিংকু এবং হাওড়ার ‘গুপ্ত সুড়ঙ্গ’ প্রাসাদের মালিক শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে গ্রেফতারির পর যখন রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়, ঠিক তখনই প্রশাসনিক স্তরে আরও এক মহাবিস্ফোরণ ঘটালেন রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ ও আদিবাসী উন্নয়ন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের জমানায় ভুয়ো জাতি শংসাপত্র (Fake Caste Certificate) নিয়ে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিলেন তিনি। ‘আজকাল ডট ইন’-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বাঁকুড়া জেলার বিধায়ক, প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিকা তথা নবনিযুক্ত মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু সাফ জানিয়ে দিলেন, ভুয়ো কাস্ট সার্টিফিকেট ব্যবহার করে যারা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের চাকরি স্রেফ খারিজই হবে না, বরং আইন মোতাবেক কড়া শাস্তিও হবে। একই সঙ্গে এই চক্রের নেপথ্যে থাকা সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও বসতে চলেছে সিআইডি (CID) তদন্ত।

একদিকে যখন ভাটপাড়া-হালিশহরে তৃণমূলের পুরবোর্ড ভাঙন রুখতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্সিলরদের ‘মাটি কামড়ে’ পড়ে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন, ঠিক অন্যদিকে নবান্নের অন্দরে দাঁড়িয়ে ভুয়ো শংসাপত্র ও বিগত সরকারের আর্থিক নয়ছয় রুখতে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর এই ব্যাক-টু-ব্যাক সিদ্ধান্ত ছাব্বিশের প্রশাসনিক সংস্কারে মস্ত বড় পদক্ষেপ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

চাকরি খারিজ ও সিআইডি তদন্তের নির্দেশ

বিগত সরকারের জমানায় ভুয়ো এসসি/এসটি সার্টিফিকেট তৈরি করে সরকারি চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠেছিল। সেই জট কাটাতে প্রথম থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে নতুন ডবল ইঞ্জিন সরকার।

সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু স্পষ্ট ভাষায় জানান:

“আমি ইতিমধ্যেই ভুয়ো সার্টিফিকেট কাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার জন্য দফতরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি (প্রধান সচিব)-দের কড়া নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি। আধিকারিকেরা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছেন এবং খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে সিআইডি (CID) তদন্ত শুরু হবে। যেসব সরকারি আধিকারিক বা কর্মীরা টাকার বিনিময়ে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই ফেক এসটি সার্টিফিকেট ইস্যু করেছেন, তাঁদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না, প্রত্যেকে শাস্তি পাবেন। আর যারা এই ভুয়ো নথি দেখিয়ে সরকারি চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, তাঁদের চাকরি তৎক্ষণাৎ খারিজ হয়ে যাবে এবং আইন মোতাবেক কঠোর সাজা হবে।”

ফান্ড বাইপাস রুখতে অডিট ও আদিবাসী উন্নয়ন

তৃণমূল জমানায় আদিবাসী ও অনগ্রসর শ্রেণীর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ টাকা অন্য খাতে ঘুরিয়ে দেওয়া বা ‘বাইপাস’ করার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েও কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বিগত দিনে ট্রাইবাল ডেভেলপমেন্টের অর্থ কীভাবে এবং কোথায় খরচ হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সচিবদের। প্রকৃত আদিবাসীদের কাছে যাতে উন্নয়নের টাকা সরাসরি পৌঁছায়, তার রুটম্যাপ ইতিমধ্যেই তৈরি করতে শুরু করেছে দফতর।

একলব্য স্কুল ও বন্ধ হস্টেল চালুর মেগা ঘোষণা

প্রান্তিক জেলা তথা গ্রামাঞ্চলের আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা মাঝপথে ছুটে যাওয়া (Drop-out Rate) এবং কলকাতায় এসে উচ্চশিক্ষার জন্য হস্টেল সমস্যার সমাধানে একগুচ্ছ জনকল্যাণমুখী ঘোষণা করেছেন স্কুল শিক্ষিকা থেকে মন্ত্রী হওয়া ক্ষুদিরাম টুডু।

তিনি জানান:

  • বন্ধ হস্টেল পুনরুজ্জীবন: রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এবং কলকাতায় এসসি ও এসটি ছাত্রছাত্রীদের জন্য যে সমস্ত সরকারি হস্টেলগুলি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে, সেগুলি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পুনরায় চালু করা হবে।
  • একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল: কেন্দ্রীয় সরকারের আদিবাসী কল্যাণ মন্ত্রকের নীতি মেনে রাজ্যের প্রতিটি ট্রাইবাল এলাকা বা ট্রাইবাল ব্লকে সম্পূর্ণ নতুন সেটআপের ‘একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল’ (Eklavya Model Residential School) তৈরি করা হবে, যাতে প্রান্তিক পড়ুয়ারা নিখরচায় বিশ্বমানের আবাসিক শিক্ষার সুযোগ পায়।

একদিকে দিল্লিতে দেশের সার্বিক সুশাসন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সাক্ষাৎকার এবং অন্যদিকে নবান্নে বসে ভুয়ো চাকরিপ্রাপকদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর এই ‘দাবাং’ অ্যাকশন— দুইয়ে মিলে ছাব্বিশের বাংলার সরকারি দফতরগুলিতে এক নজিরবিহীন শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *