‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ঘিরে জাতীয় নিরাপত্তায় উদ্বেগ! গোয়েন্দা রিপোর্ট হাতিয়ার করে এবার কড়া অ্যাকশনের পথে কেন্দ্র

ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নরেন্দ্র মোদির ‘মেলোডি’ টফি উপহারের মিষ্টি আবহ এবং বাংলায় ২০ জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীর মেয়াদ বৃদ্ধির মেগা খবরের মাঝেই, দেশের সাইবার ও রাজনৈতিক দুনিয়ায় এক অভূতপূর্ব তোলপাড় শুরু হলো। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নেটদুনিয়ায় যে ‘ব্যঙ্গ-বিপ্লব’ বা মিম আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, তা এবার দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগের (IB) রাডারে চলে এল। আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরীবালের প্রাক্তন সহযোগী অভিজিৎ দীপকের গড়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-কে ‘জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে গোয়েন্দা রিপোর্টে। আর এই রিপোর্টকে হাতিয়ার করেই এবার এই ‘প্যারোডি পার্টি’র বিরুদ্ধে কেন্দ্র কঠোর আইনি পদক্ষেপ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
একদিকে যখন ভুয়ো কাস্ট সার্টিফিকেটধারীদের চাকরি বাতিলের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু এবং হাওড়ায় ‘গুপ্ত সুড়ঙ্গ’ প্রাসাদের মালিক শামিম আহমেদ মুম্বই থেকে গ্রেফতার হচ্ছেন— সেই হাই-প্রোফাইল আবহের মধ্যেই এই ডিজিটাল যুব আন্দোলন রুখতে নয়া দিল্লির এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধান বিচারপতির মন্তব্য এবং ‘আরশোলা বিপ্লব’-এর সূত্রপাত
এই গোটা বিতর্কের সূত্রপাত হয় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে। দেশের যুব সম্প্রদায়ের একাংশকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি ‘আরশোলা’ (Cockroach) এবং ‘পরজীবী’ (Parasite) বলে উল্লেখ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতির মতে, এই তরুণ-তরুণীরা অন্য কোনো মূলধারার পেশায় জায়গা না পেয়ে রাতারাতি সাংবাদিক, সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারী বা তথ্যের অধিকার (RTI) কর্মী সেজে বসেন এবং বানোয়াট তথ্য দিয়ে সকলকে আক্রমণ করতে থাকেন।
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ও কটাক্ষ করে গত ১৬ মে নেটদুনিয়ায় আত্মপ্রকাশ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। একটি সম্পূর্ণ ‘অনলাইন স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ বা ব্যাঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে পথ চলা শুরু করেই এটি যুবসমাজের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের কড়া ধারায় এক্স (X) হ্যান্ডল ব্লক!
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ৬৯(এ) (69A IT Act) ধারায় সিজেপির অফিশিয়াল হ্যান্ডলটি অবিলম্বে স্থগিত বা সাসপেন্ড রাখতে বলেছিল এক্স (সাবেক টুইটার) কর্তৃপক্ষকে। আইবি (IB) রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই এই জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছিল। দিল্লির এই নির্দেশের পরেই ভারতে সিজেপির এক্স হ্যান্ডলটি সাময়িকভাবে ‘ব্লক’ করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাক-স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্যাটায়ারের অধিকার নিয়ে নেটপাড়ায় তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছে। নেটিজেনদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের ক্ষমতাসীন দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (BJP)-র নামের সাথে সাযুজ্য রেখে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নাম রাখা এবং হু হু করে জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণেই কি মোদি সরকারকে এই পদক্ষেপ করতে হলো?
ইনস্টাগ্রামে ১৮ মিলিয়ন হিট! বিজেপিকে টপকে রেকর্ড সিজেপির
এক্স হ্যান্ডল ব্লক করা হলেও এই ডিজিটাল আন্দোলনকে যে দমানো যাচ্ছে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন আমেরিকা প্রবাসী এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। শুক্রবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে আরশোলার চিরজীবী বিবর্তনের তত্ত্ব টেনে (যা চাণক্যের দর্শন ও বিজ্ঞানের মতোই অমোঘ) তিনি লিখেছেন:
“আরশোলারা কখনো মরে না। সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আমরা এবার ইনস্টাগ্রামে ১৮ মিলিয়ন (১ কোটি ৮০ লক্ষ) হিট বা ফলোয়ারের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললাম।”
উল্লেখ্য, ডিজিটাল দুনিয়ায় এই মুহূর্তে খোদ শাসকদল বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যাও ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) পেরোয়নি, সেখানে মাত্র এক সপ্তাহে সিজেপি সেই রেকর্ড ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছে।
মাথা চাড়া দিচ্ছে ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ (NPF)
এদিকে সিজেপি-কে ঘিরে যখন সরকারি ও গোয়েন্দা স্তরে হাই-অ্যালার্ট জারি হয়েছে, ঠিক তখনই প্রধান বিচারপতির ‘পরজীবী’ মন্তব্যকে হাতিয়ার করে নেটদুনিয়ায় আত্মপ্রকাশ করেছে আরও একটি নতুন মিম ও ডিজিটাল যুব সংগঠন— ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ (NPF)। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও রেডিটের দেওয়ালে দেওয়ালে এখন এই দুই প্যারোডি সংগঠনের মিম ও পোস্টের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
একদিকে যখন ভাটপাড়া-হালিশহরে ধস রুখতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্সিলরদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন, অন্যদিকে দিল্লির বিশ্বমঞ্চে ‘মেলোডি’ টফির চকলেটি স্বাদ নিয়ে আলোচনা চলছে— সেই চেনা রাজনীতির সমান্তরালে দেশের এই ডিজিটাল ‘আরশোলা ও পরজীবী’ আন্দোলন আগামী দিনে সাইবার আইন বনাম বাক-স্বাধীনতার লড়াইকে কোন স্তরে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।