পাঁচ দিন পর নামবে পারদ! চরম অস্বস্তিকর গরমের মাঝেই দক্ষিণবঙ্গে কালবৈশাখীর হলুদ সতর্কতা

দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া নিয়ে বড় আপডেট দিল আলিপুর আবহাওয়া দফতর। চৈত্র-বৈশাখের চেনা দাবদাহের পর মে মাসের শেষে এসেও গরমে নাজেহাল সমগ্র দক্ষিণবঙ্গবাসী। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে এমনিতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকলেও, বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে হাঁসফাঁস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এই অস্বস্তিকর গরমের মাঝেই আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম থেকে কলকাতা— সর্বত্রই যখন এই গুমোট গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার খতিয়ান এবং গরম কমার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ স্পষ্ট করল আবহাওয়া দফতর।
কেন এই হাঁসফাঁস পরিস্থিতি? ব্যাখ্যা হাওয়া অফিসের
তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও কেন দক্ষিণবঙ্গে এতটা আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি ভোগাচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন আবহবিদেরা। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, এই মুহূর্তে প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার ওপর একটি উচ্চচাপযুক্ত ঘূর্ণাবর্ত অবস্থান করছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উচ্চতায় রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ থেকে ওড়িশার ওই ঘূর্ণাবর্ত পর্যন্ত একটি সুদীর্ঘ অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে।
এই জোড়া সিস্টেমের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে হু হু করে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করছে। এই বিপুল জলীয় বাষ্পের জেরেই উত্তরবঙ্গে লাগাতার ঝড়বৃষ্টি চললেও, দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বিশেষ করে পশ্চিমের অংশে আর্দ্রতা মারাত্মক বেড়ে যাওয়ায় ঘর্মাক্ত ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গে ঝড়ের হলুদ সতর্কতা ও গরমের দাপট
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিন রাজ্যের তাপমাত্রার বড় কোনো হেরফের হবে না। তবে তার পরের দু’দিনে ধীরে ধীরে দিনের তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমবে।
আপাতত জেলাগুলির জন্য যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে:
- কালবৈশাখীর পূর্বাভাস: আজ শনিবার পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূমে হালকা বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এই জেলাগুলিতে ঝড়ের জন্য ‘হলুদ সতর্কতা’ (Yellow Alert) জারি করা হয়েছে।
- দাবদাহের সতর্কতা: বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও ভ্যাপসা গরম থেকে এখনই মুক্তি নেই। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও দুই বর্ধমানে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গরমের জন্য সমান্তরাল সতর্কতা জারি থাকবে। এর পরেই মূলত দাবদাহ কিছুটা কমবে।
পুরুলিয়ায় সুনসান রাস্তা, আদালতে গরমের ছুটি
পশ্চিমের জেলাগুলির অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। পুরুলিয়াতে সকাল ১০টার পর থেকেই রাস্তাঘাট কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়ছে। তীব্র গরম উপেক্ষা করেই শুক্রবার পুরুলিয়া জেলা আদালতে মানুষের ঢল নেমেছিল, কারণ এরপরই আদালতে গরমের ছুটি পড়ে যাচ্ছে।
তীব্র রোদ ও লু-এর হাত থেকে বাঁচতে পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজের সুপার তথা সহকারী অধ্যক্ষ সুকমল বিশোই সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, “সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খুব প্রয়োজন না থাকলে বাড়ি থেকে বেরোবেন না। রোদ থেকে বাঁচতে মাথায় ছাতা বা আচ্ছাদন ব্যবহার করুন, হালকা সুতির পোশাক পরুন এবং শরীর হাইড্রেটেড রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ও ওআরএস পান করুন।” বীরভূমের দুবরাজপুর ও বাঁকুড়াতেও বিকেলে সামান্য বৃষ্টি হলেও তা কেবল অস্বস্তিই বাড়িয়েছে, স্বস্তি মেলেনি।
উত্তরবঙ্গে রবি-সোমবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির দাপট
দক্ষিণবঙ্গ যখন চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায়, উত্তরবঙ্গে তখন বর্ষার আবহে লাগাতার ঝড়বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে টানা বৃষ্টি চলবে। বিশেষ করে আজ শনিবার দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে ভারী (৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার) বৃষ্টির জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই জেলাগুলির সব জায়গায় না হলেও, বেশ কিছু পকেটে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত এই ভারী বৃষ্টির দাপট বজায় থাকবে।
একদিকে যখন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘সুশাসন’ বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে, এবং অন্যদিকে জুনের ১ তারিখ থেকে ১০টি পরিচয়পত্রের যেকোনো একটি দেখিয়ে মহিলাদের বিনামূল্যে বাস সফরের মেগা প্রস্তুতি চলছে— সেই হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতার মাঝেই আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা ও পাঁচ দিন পর তাপমাত্রা কমার পূর্বাভাসই এখন বঙ্গবাসীর প্রধান চর্চার বিষয়।