২৯ দিনের ঐতিহাসিক রেকর্ড বিচার, শিশু ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দিল বাংলাদেশের আদালত

আইনি ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মাত্র ২৯ কর্মদিবসের মধ্যে শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের একটি আদালত। দেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে কোনো ধর্ষণ মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে ৯ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া যুবক শাকিল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন বিচারক। গত রবিবার দুপুরে মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইবুনালের বিচারক তাজুল ইসলাম এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ জুন সকালে ওই শিশুটি মাঠে তার বাবার জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার সময় শাকিল হোসেন তাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। ঘটনাটি জানার পর ওই দিনই শিশুটির বাবা গাংনী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ও বিচার বিভাগের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে মাত্র ২৯ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল।
দ্রুত বিচার ও সামাজিক প্রভাব
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে এই দ্রুত রায়দানের দৃষ্টান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাধারণত বাংলাদেশে এই ধরনের সংবেদনশীল মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় বা পার পাওয়ার সুযোগ খোঁজে। মাত্র ২৯ দিনে বিচার সম্পন্ন হওয়া অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।
ঢাকার ঘটনাতেও দ্রুত রায়ের ইঙ্গিত
মেহেরপুরের এই ঐতিহাসিক রায়ের আবহেই রাজধানী ঢাকার পল্লবিতে ঘটে যাওয়া আরেকটি বহুল আলোচিত ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলাতেও অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিচারিক কাজ এগোচ্ছে। গত ১৯ মে পল্লবির একটি ফ্ল্যাট থেকে ওই শিশুর খণ্ডিত দেহ উদ্ধারের পর দেশজুড়ে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ইতিমধ্যে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
এই ঘটনার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিহত শিশুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন এবং শিশুর দিদির পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে সরকার একজন স্পেশাল পিপি নিয়োগ করেছে এবং আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এই মামলার বিচারকাজ শেষ হতে পারে।
সামাজিক অবক্ষয় ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ
কঠোর আইন এবং মেহেরপুরের মতো দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়ার পরও দেশজুড়ে শিশু নির্যাতনের ঘটনা পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। সম্প্রতি কুমিল্লা জেলার লাকসামেও এক ৬ বছর বয়সি শিশুকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে আবদুল রশিদ নামের এক প্রভাবশালী বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। এই ধরনের ধারাবাহিক অপরাধের পেছনে সামাজিক মূল্যবোধের অভাবকে দায়ী করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই ধরনের অপরাধ রুখতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি বড় ধরনের সমাজ সংস্কার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।