চ্যাটজিপিটি-র মারাত্মক কীর্তি! আসল গবেষণাপত্রে দেড় লাখ ‘ভুয়ো তথ্য’ ঢুকিয়ে দিল এআই

গবেষণার দুনিয়ায় এআই ভাইরাসের হানা, এক বছরেই দেড় লাখ ভুয়া রেফারেন্সের অনুপ্রবেশ!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে বিশ্বজুড়ে গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন এক বড়সড়ো সংকটের মুখে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহারের কারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে (রিসার্চ পেপার) হু হু করে বাড়ছে ভুয়া এবং কাল্পনিক তথ্যসূত্র বা সাইটেশনের সংখ্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি, ইউসিএলএ এবং ইউসি বার্কলের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এই বিস্ফোরক তথ্য। ‘এলএলএম হ্যালুসিনেশনস ইন দ্য ওয়াইল্ড’ শীর্ষক এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু ২০১৫ সালেই প্রায় দেড় লাখ মনগড়া ও নকল রেফারেন্স মূল ধারার বৈজ্ঞানিক রেকর্ডের অংশ হয়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
গবেষকরা ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ২৫ লক্ষ রিসার্চ পেপারের প্রায় ১১.১ কোটি সাইটেশন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে এই জালিয়াতি ধরেছেন। দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর থেকে এই ভুয়া তথ্যের গ্রাফ হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে, যা মূলত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে চরম আকার ধারণ করে। চ্যাটজিপিটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক ১৮ মাস পর থেকে এই উল্লম্ফন ঘটে। কারণ, এই সময়ে এআই টুলগুলো কেবল লেখার সহায়তাকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল ও কাল্পনিক তথ্যসূত্র তৈরি করার ইঞ্জিন হিসেবে কাজ শুরু করে। ওপেনঅ্যালেক্স বা গুগল স্কলারের মতো বড় অ্যাকাডেমিক ডেটাবেসের তথ্যের সাথে মিল না মেলাতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই কারসাজি প্রকাশ্যে আসে।
সুরক্ষা কবচ ব্যর্থ ও বায়োমেডিকেলে বড় বিপদ
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই জালিয়াতি কোনো নির্দিষ্ট ভুয়া পেপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্পূর্ণ বৈধ এবং আসল দেখতে গবেষণাপত্রের ভেতরেও অত্যন্ত চতুরতার সাথে কয়েকটি করে নকল রেফারেন্স ছড়িয়ে রাখা হচ্ছে। অনেক গবেষক এআই-এর দেওয়া এই সমস্ত রেফারেন্সের সত্যতা যাচাই না করেই সরাসরি নিজেদের পেপারে ব্যবহার করছেন। বর্তমানের পিয়ার-রিভিউড জার্নালগুলোর প্রচলিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা এই সূক্ষ্ম জালিয়াতি সনাক্ত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে প্রি-প্রিন্ট স্তর পেরিয়ে এই ভুয়ো সাইটেশনগুলো অনায়াসেই মূল জার্নালগুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে।
এই জালিয়াতির থাবা থেকে বাদ যায়নি চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রও। বায়োমেডিকেল রিসার্চ পেপার নিয়ে করা পৃথক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে যেখানে প্রতি ২,৮২৮টি পেপারের মধ্যে মাত্র একটিতে ভুয়া সাইটেশন মিলত, ২০২৬ সালের শুরুতে এসে তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে প্রতি ২৭৭টি পেপারে একটিতে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই সমস্যাটি এখন একটি চক্রাকার ফাঁদে রূপ নিচ্ছে। এআই টুলগুলো ভবিষ্যতে নতুন পেপার লেখার সময় ইন্টারনেট থেকে পুরনো এই ভুল ও কাল্পনিক তথ্যগুলোকেই সত্য বলে ধরে নেবে এবং পুনরায় ব্যবহার করবে, যা সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মকভাবে কলঙ্কিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এক ঝলকে
- এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে প্রায় ১.৫ লাখ এআই-জনারেটেড ভুয়া সাইটেশন বা রেফারেন্স ঢুকে পড়েছে।
- ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এআই টুলগুলো সরাসরি কাল্পনিক রেফারেন্স তৈরি শুরু করায় এই জিয়ালিয়াত চরম রূপ নেয়।
- বায়োমেডিকেল ক্ষেত্রে জালিয়াতির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২০২৬ সালের শুরুতে প্রতি ২৭৭টি পেপারের মধ্যে ১টিতে দাঁড়িয়েছে।
- প্রচলিত জার্নালগুলোর রিভিউ সিস্টেম এই আধুনিক প্রযুক্তিগত জালিয়াতি ও নকল সাইটেশন রুখতে ব্যর্থ হচ্ছে।