অনলাইন পেমেন্ট ট্র্যাক করে পুরীর রিসর্টে হানা! ‘ছেঁড়া পাজামা’ পরে পালানো তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল অবশেষে ধৃত

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে একের পর এক ডেরা বদলে এবং ফেসবুক লাইভ করে চ্যালেঞ্জ ছুড়েও শেষরক্ষা হলো না। ওডিশার পুরীর মেরিন ড্রাইভের এক বিলাসবহুল রিসর্ট থেকে অবশেষে মোবাইল টাওয়ার লোকেশন এবং অনলাইন পেমেন্টের সূত্র ধরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের পলাতক তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলকে গ্রেফতার করল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় এনে আজ, বৃহস্পতিবারই তাঁকে আলিপুর আদালতে পেশ করা হবে।
শুভেন্দুকে হুমকি দিয়ে শুরু, জানালা টপকে পলায়ন
ঘটনার সূত্রপাত গত ১১ মে। নিজের নির্বাচনী এলাকায় এক বিজয় মিছিল থেকে বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলের একটি বিতর্কিত বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ১৫ বছর ধরে অনেক সংযম দেখিয়েছেন, কিন্তু তা আর চলবে না। সরাসরি বিরোধী বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশ্যে হুমকির সুরে তিনি বলেন, “তোদের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জিজ্ঞাসা করিস, দিলীপ মণ্ডল কে?”
এই মন্তব্যের পর বিষ্ণুপুর থানায় জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হতেই গত ১৪ মে পৈলানে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই নাটকীয়ভাবে নিজের রাজপ্রাসাদের জানালা টপকে, ছেঁড়া পাজামা পরে এবং স্থানীয় এক ব্যক্তির জুতো পায়ে গলিয়ে চম্পট দেন বিধায়ক।
পুলিশকে বোকা বানিয়ে ডেরা বদল ও ফেসবুক লাইভ
বাড়ি থেকে পালানোর পর পুলিশকে রীতিমতো নাকানিচোবানি খাইয়েছেন দিলীপ বাবু। প্রথমে মন্দিরবাজার এলাকায় এক অনুগামীর বাড়ি, তারপর সরিষা, কাকদ্বীপ সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রান্তে ডেরা বদলে গা ঢাকা দেন তিনি। এমনকি পুলিশ যখন তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, তখন ছদ্মবেশে থেকেই ফেসবুক লাইভ করছিলেন তিনি। পুলিশ সেই লাইভের সূত্র ধরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর আগেই প্রতিবার ডেরা বদলে ফেলছিলেন বিধায়ক।
ছেলের গ্রেফতারি ও অনলাইন পেমেন্টেই মিলল পুরীর সূত্র
তবে সম্প্রতি ডায়মন্ড হারবারে দিলীপ মণ্ডলের ছেলে অর্ঘ্য মণ্ডল অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সহ গ্রেফতার হতেই তদন্তের মোড় ঘোরে। ছেলেকে জেরা করে বিধায়কের একটি নতুন মোবাইল নম্বর হাতে পান গোয়েন্দারা। সেই নম্বরের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করতেই জানা যায় দিলীপ বাবু ওডিশার পুরীতে রয়েছেন। এর পাশাপাশি তাঁর একটি অনলাইন পেমেন্টের সূত্র ধরে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, পুরীর মেরিন ড্রাইভ এলাকার একটি নামী রিসর্ট থেকে লেনদেন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার রিসর্টে এসটিএফের খাঁচায় বিধায়ক
অনলাইন পেমেন্টের সূত্র ধরে মঙ্গলবারই পুরীর ওই রিসর্টে হানা দেয় বেঙ্গল এসটিএফের একটি বিশেষ দল। হোটেলের রেজিস্টার এবং সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখে বিধায়কের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পর, একটি বিলাসবহুল ঘর থেকে তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়। জানা গিয়েছে, এই চেনা রিসর্টে তিনি আগেও এসে থেকেছেন। ধৃত বিধায়ক জেরায় স্বীকার করেছেন, কলকাতা থেকে এক পরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে চেপে তিনি পুরী পালিয়ে এসেছিলেন এবং ধরা পড়ার ভয়ে সেখানেও বারবার হোটেল পাল্টাচ্ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল পেমেন্টের ফাঁদেই বন্দি হতে হলো বিষ্ণুপুরের এই দাপুটে নেতাকে।