ঘেপান হ্রদের জলস্তর বৃদ্ধিতে তীব্র আতঙ্ক, কেদারনাথ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় হিমাচলের সিসু গ্রাম

ঘেপান হ্রদের জলস্তর বৃদ্ধিতে তীব্র আতঙ্ক, কেদারনাথ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় হিমাচলের সিসু গ্রাম

হিমাচল প্রদেশের লাহুল-স্পিতির শান্ত ও মনোরম পাহাড়ি গ্রাম সিসু এখন এক চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। ৪,০৬৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হিমবাহ হ্রদ ‘ঘেপান’-এর জলস্তর ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এই হ্রদে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিলে ২০১৩ সালের কেদারনাথের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে এখানে। চন্দ্র নদীর তীরে অবস্থিত সিসু গ্রামটি অটল টানেল থেকে বেরোনোর পরেই প্রথম বড় জনবসতি, যা বর্তমানে এই পরিবেশগত হুমকির কেন্দ্রে রয়েছে।

২০২০ সালের অক্টোবরে অটল টানেল চালু হওয়ার পর থেকে সিসু গ্রামে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন যাতায়াতের পাশাপাশি নদীর তীরে বোটিং, জিপলাইন, অফ-রোড ড্রাইভিংয়ের মতো বাণিজ্যিক পর্যটন কার্যকলাপ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক উন্নতির আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে এক মহাবিপদ। গ্রাম থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঘেপান হিমবাহ হ্রদটি এক চলন্ত টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে।

হ্রদের দ্রুত বিস্তৃতি ও বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা

স্যাটেলাইট চিত্র ও বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে ঘেপান হ্রদের আয়তন ছিল মাত্র ৩৬.৪৯ হেক্টর। ২০২২ সালের মধ্যে তা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০১.৩০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকে ঘেপান হিমবাহটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২.৭৬ কিলোমিটার পিছিয়ে গেছে এবং প্রতি বছর গড়ে ৫৩ মিটার করে সংকুচিত হচ্ছে।

ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (এনআরএসসি) এই হ্রদটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। বিজ্ঞানীদের পর্যালোচনা করা আটটি ভিন্ন পরিস্থিতির সবকটিতেই সিসু গ্রামটি সরাসরি বিপদসীমার মধ্যে পড়েছে। হ্রদটি ফেটে গেলে মাত্র ২১ মিনিটের মধ্যে ৪৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে বন্যার জল সিসু গ্রামে আছড়ে পড়তে পারে।

সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র

এই আকস্মিক বন্যায় শুধু জল নয়, বরং ভারী ধ্বংসাবশেষ, বিশালাকার পাথর ও হিমবাহের খণ্ড বয়ে আসবে। এর ফলে সিসু সহ ৩৪টি জনবসতি সম্পূর্ণ মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ২০৪ হেক্টর চাষযোগ্য জমি, ৫৭টি সেতু এবং ১০৬ কিলোমিটার সড়কপথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ মানালি-লেহ মহাসড়ক, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অটল টানেল এবং সমগ্র পর্যটন পরিকাঠামো এই ধ্বংসলীলার শিকার হতে পারে। এমনকি এই বন্যার প্রভাব চন্দ্র ও চেনাব নদীর মাধ্যমে সুদূর জম্মু ও কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণ ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া এবং উঁচু পার্বত্য এলাকায় তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত হওয়াই এই হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার মূল কারণ। বৃষ্টির জল বরফকে আরও দ্রুত গলিয়ে দিচ্ছে, যা হ্রদের জলস্তর বাড়িয়ে হিমবাহটিকে আরও সংকীর্ণ করছে।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ শুরু করেছে। সিসু হ্রদে সেন্সর, ক্যামেরা এবং স্যাটেলাইট-ভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সম্বলিত একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে গ্রামটিতে কোনো পূর্ণাঙ্গ আগাম সতর্কীকরণ সাইরেন, নির্দেশক বোর্ড বা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ নেই। হিমাচল প্রদেশে ২০১৬ সালে যেখানে ৮০৫টি হিমবাহ হ্রদ ছিল, তা ২০২২ সালের মধ্যে বেড়ে ১,৬১৯টি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, ঘেপান হ্রদের এই সংকট আসলে সমগ্র হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়ের এক ভয়ঙ্কর পূর্বাভাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *