‘নরমাল পিরিয়ড পেন’ ভেবে ভুল করছেন না তো, বন্ধ্যাত্ব ডেকে আনা রোগের ইঙ্গিত এবার মাসিকের রক্তেই!

বছরের পর বছর তীব্র পিরিয়ড পেন, তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা, ক্লান্তি বা সন্তানধারণে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও নারীদের শরীরে রোগ ধরা পড়তে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বহু নারী বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের শরীরের ভেতরে নিঃশব্দে বাড়ছে এন্ডোমেট্রিওসিস। এবার সেই জটিল রোগ নির্ণয়ে এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। সম্প্রতি ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শুধুমাত্র পিরিয়ড বা মাসিকের রক্ত পরীক্ষা করেই ভবিষ্যতে এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে রোগ নির্ণয়ের জন্য অস্ত্রোপচারভিত্তিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এন্ডোমেট্রিওসিস কী ও কেন এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি শারীরিক সমস্যা, যেখানে জরায়ুর ভেতরের আবরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরের অংশে, যেমন ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব বা পেলভিসের আশপাশে বাড়তে শুরু করে। এই টিস্যু মাসিকের সময় জরায়ুর আবরণের মতো ফুলে ওঠে ও রক্তক্ষরণ ঘটায়, কিন্তু শরীর থেকে বের হতে পারে না। ফলে ভেতরে ভেতরে তীব্র প্রদাহ, ক্ষত এবং অসহনীয় ব্যথা সৃষ্টি হয়। বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সের প্রায় ১০ শতাংশ নারী এই সমস্যায় ভোগেন, অথচ রোগ নির্ণয়ে গড়ে ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত দেরি হয়ে যায়।
বর্তমানে এই রোগ নিশ্চিত করতে ল্যাপারোস্কোপি বা অস্ত্রোপচারভিত্তিক পরীক্ষা করতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। গবেষকদের মতে, মাসিকের রক্তে থাকা বিশেষ জৈবিক চিহ্ন বা বায়োমার্কার, রোগপ্রতিরোধকারী কোষের পরিবর্তন এবং প্রদাহজনিত সংকেত বিশ্লেষণ করে এই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। নতুন এই পদ্ধতি সফল হলে খুব কম খরচে, সহজে এবং দ্রুত রোগ ধরা পড়বে, যার ফলে বছরের পর বছর ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার শিকার হতে হবে না।
ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
নারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং পিরিয়ডের ব্যথাকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে চেপে রাখার প্রবণতাই এই রোগটি দেরিতে শনাক্ত হওয়ার মূল কারণ। এন্ডোমেট্রিওসিস শুধু শারীরিক ব্যথাই বাড়ায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে নারীর প্রজননক্ষমতা কমিয়ে বন্ধ্যাত্ব ডেকে আনতে পারে। সেই সঙ্গে এটি যৌনস্বাস্থ্যে সমস্যা, মলমূত্র ত্যাগে জটিলতা এবং তীব্র মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মাসিকের রক্ত পরীক্ষার এই আধুনিক পদ্ধতি যদি চূড়ান্ত স্বীকৃতি পায়, তবে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্য পরিষেবায় এক বড় বিপ্লব আনবে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে পরিকাঠামোর অভাব ও সামাজিক লজ্জার কারণে বহু নারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন, সেখানে এই সহজ পরীক্ষাটি দ্রুত রোগ নির্ণয় করে বহু নারীকে অকাল বন্ধ্যাত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে পারে।