খালি চেয়ারের ধাক্কায় বাতিল কালীঘাটের বৈঠক, শাসকদলে কি তবে মহা-ভাঙনের অশনি সঙ্কেত!

রবিবার বিকেলে কালীঘাটে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে ডাকা পরিষদীয় দলের বৈঠককে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ডাক পাওয়া ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন মাত্র ২০ জনের মতো। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের অনুপস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি বাতিল করতে বাধ্য হয় দলীয় নেতৃত্ব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঘটনা শাসকদলের অন্দরে এক গভীর ফাটল ও চরম সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিধায়কদের অনুপস্থিতি ও ক্ষোভের আবহ
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার বিকেলের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য তৃণমূলের নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককেই বার্তা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সাকুল্যে ২০ জন বিধায়ক উপস্থিত হওয়ায় দলের অন্দরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়। যদিও পরিস্থিতির সামাল দিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ দাবি করেন, বিধায়কেরা দলের সঙ্গেই আছেন। অনেকে নিজ নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদ মিছিল এবং আইনি সহায়তার কাজে যুক্ত থাকায় আসতে পারেননি। তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতির কারণ কেবলই ‘ব্যস্ততা’ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ।
এই সংকটের সূত্রপাত মূলত শনিবার থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসূচিতে দলের কোনো পরিচিত নেতা, মন্ত্রী বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার শীর্ষ নেতাদের দেখা যায়নি। উপরন্তু, ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে একাধিক বিধায়ক ও সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও অনেকেই ফোন বন্ধ রেখে বা বিভিন্ন অজুহাতে সেই সফর এড়িয়ে যান। এমনকি অভিষেকের ওপর হামলার ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে নিন্দাসূচক পোস্ট করার দলীয় অনুরোধও অধিকাংশ বিধায়ক উপেক্ষা করেছেন বলে জানা গেছে।
পাল্টা কৌশল ও রাজপথে আন্দোলনের রূপরেখা
বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ঢাকতে এবং কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে পাল্টা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তৃণমূল নেতৃত্ব। সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার বিরুদ্ধে আগামী ১ জুন রাজ্যের প্রতিটি পুর অঞ্চল ও পঞ্চায়েত এলাকায় তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে, এই রাজনৈতিক চাপ সামলাতে খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মাঠে নামছেন। আগামী ২ জুন কলকাতার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে এক ধর্না কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উপস্থিত থাকবেন। রাজনৈতিক হিংসার প্রতিবাদের পাশাপাশি কলকাতার হকার উচ্ছেদের মতো জনস্বার্থবাহী ইস্যুকে সামনে রেখে এই ধর্না পরিচালিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, দলের অভ্যন্তরীণ এই সম্ভাব্য ভাঙন ও অসন্তোষ রুখতে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব এখন রাজপথের আন্দোলনকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছে।