বিশ্বজয় করল ভারতের মশলা চা, পেছনে ফেলল মেক্সিকোর চকোলেট থেকে তুরস্কের কফি

বিশ্বজয় করল ভারতের মশলা চা, পেছনে ফেলল মেক্সিকোর চকোলেট থেকে তুরস্কের কফি

বাঙালির সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে অফিসের ক্লান্তি দূর করা কিংবা পাড়ার মোড়ের রাজনৈতিক আড্ডা—সবখানেই জড়িয়ে রয়েছে এক কাপ চা। ব্রিটিশদের হাত ধরে এ দেশে চা পানের সূচনা হলেও, ভারতীয়রা তাতে আদা, এলাচ, লবঙ্গ ও দারচিনির যুগলবন্দি ঘটিয়ে তৈরি করেছে এক জাদুকরী পানীয়। আর এবার সেই ঐতিহ্যের মশলা চা বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে নিল। আন্তর্জাতিক ফুড গাইড ‘টেস্টঅ্যাটলাস’ (TasteAtlas)-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় মেক্সিকোর হট চকোলেট, তুরস্কের তুর্কি কফি এবং জাপানের ম্যাচার মতো বিশ্বখ্যাত পানীয়গুলোকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করেছে ভারতের এই ঘরোয়া পানীয়।

কেন বিশ্বসেরা হল মশলা চা

টেস্টঅ্যাটলাসের বিচারে মশলা চা ৫-এর মধ্যে ৪.৯ রেটিং পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বিচারকদের মতে, এই চায়ের মূল শক্তি হলো এর ফ্লেভারের জটিলতা বা ‘কমপ্লেক্সিটি’। এক চুমুকেই মিলবে ঝাল, মিষ্টি, তেতো ও ঝাঁঝালো স্বাদের এক অপূর্ব মিশ্রণ। আদার ঝাঁঝ যেমন নিমেষে মন চাঙ্গা করে, তেমনি এলাচের সুবাস ও দারচিনির উপস্থিতি মেটাবলিজম বাড়িয়ে দেয়। লবঙ্গ গলার আরাম দেয় আর কড়া লিকার ও দুধের ক্রিমি টেক্সচার একে অনন্য করে তোলে। পাঁচ টাকার রাস্তার টং দোকান থেকে শুরু করে ফাইভ স্টার হোটেল—সব জায়গায় সমানভাবে জনপ্রিয় এই পানীয়টি মূলত এর সর্বজনীনতার কারণেই বিশ্বমঞ্চে বাজিমাত করেছে।

ইতিহাস ও ভেষজ গুণাগুণের রসায়ন

অনেকে ভাবেন চা কেবলই ব্রিটিশদের অবদান, তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ভারতে মশলাযুক্ত পানীয় বা ‘কাড়া’ খাওয়ার চল প্রায় ৫০০০ বছরের পুরোনো। আয়ুর্বেদে সর্দি-কাশির ওষুধ হিসেবে তুলসি, আদা ও গোলমরিচ ফুটিয়ে এই পানীয় তৈরি হতো, যাতে কোনো চা পাতা থাকত না। পরবর্তীতে ১৮৩০ সালে ব্রিটিশরা আসামে বাণিজ্যিক চা চাষ শুরু করলে এবং ১৯০০ সালের পর ভারতীয়রা তাতে নিজেদের মশলা যুক্ত করলে আজকের আধুনিক মশলা চায়ের জন্ম হয়। স্বাধীনতার পর রেল স্টেশন ও কলকারখানায় সস্তায় শক্তি জোগাতে এই ‘কাটিং চা’ তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পুষ্টিবিদদের মতে, এই চা কেবল সুস্বাদুই নয়, বরং অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। আদা ও গোলমরিচ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এলাচ ও দারচিনি হজমে সাহায্য করে এবং চায়ের উপাদান মানসিক চাপ দূর করতে ভূমিকা রাখে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর বিশ্বজুড়ে ভারতীয় মশলা চায়ের চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যেই ভারতে আসা বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ‘স্ট্রিট চা এক্সপেরিয়েন্স’ বা রাস্তার ধারের দোকানের চা পানের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দিল্লির শর্মা জি কা চা, কলকাতার বালিগঞ্জের শর্মা টি কিংবা মুম্বাইয়ের কাটিং চায়ের মতো ভারতের বিখ্যাত চায়ের ঠেকগুলো এখন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। বিশ্বসেরার এই তকমা ভারতের পথচলতি সাধারণ চায়ের দোকান বা ট্যাপরিগুলোকে এক বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনে দেশের পর্যটন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *