ভারতের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে নেপাল! প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিতে উত্তাল কাঠমান্ডু

গণ-অভ্যুত্থানের পর সদ্য ক্ষমতায় আসা নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে কাঠমান্ডুর রাজনৈতিক মহল। নেপালের সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, কেবল ভারতই নেপালের জমি দখল করেনি, বরং নেপালও বহু জায়গায় ভারতের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক বিবৃতিতে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে এর স্বপক্ষে প্রমাণ দাবি করেছে।
নেপালের সংসদে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এমন কিছু তথ্য জানতে পেরেছেন যা অত্যন্ত চমকপ্রদ। তাঁর মতে, উভয় দেশেরই উচিত এখন বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা। প্রধানমন্ত্রী আরও জানান যে, কাঠমান্ডু ইতিমধ্যেই এই সীমান্ত বিরোধের বিষয়টি চীন এবং যুক্তরাজ্যের কাছে উত্থাপন করেছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের সূত্র ধরে যুক্তরাজ্যের সাথে এই অঞ্চলে সীমানা নির্ধারণের ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।
ড্যামেজ কন্ট্রোলে বিদেশমন্ত্রক ও বিরোধীদের তীব্র ক্ষোভ
প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে সংসদে তোলপাড় শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে নেপালের বিদেশমন্ত্রক। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক বিবৃতিতে মন্ত্রকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে, ভারতীয় ভূখণ্ডে নেপালের ‘অনুপ্রবেশ’ সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি মূলত দুই দেশের সীমান্ত পারাপার এবং ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ বা অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত এলাকায় অবৈধ দখলের ঘটনাকে নির্দেশ করে। তবে সরকারের এই ব্যাখ্যায় শান্ত হয়নি বিরোধী শিবির। নেপালি কংগ্রেস এবং নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা এই বক্তব্যকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে সংসদীয় রেকর্ড থেকে তা মুছে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। সাবেক বিদেশমন্ত্রী প্রদীপ গাওয়ালী এই মন্তব্যের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলেছেন।
কৌশলগত গুরুত্ব ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব
ভারত ও নেপালের মধ্যে প্রায় ১৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, যার সিংহভাগই ঘনবসতিপূর্ণ। দীর্ঘকাল ধরে দুই দেশের মধ্যে মূল সীমান্ত বিরোধটি মূলত কালাজল, লিপুলেখ পাস এবং লিম্পিয়াধুরা—এই তিনটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। উত্তরাখণ্ড রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলটি ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এটি ভারত, চীন ও নেপালের ত্রি-দেশীয় সংযোগস্থলের (ট্রাই-জংশন) কাছে অবস্থিত। তিব্বতের পবিত্র কৈলাস মানস সরোবরে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার পথটি এই অঞ্চলের ওপর দিয়েই গিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বলেন্দ্র শাহের এই স্বীকারোক্তি দীর্ঘদিনের ভারত-নেপাল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। একদিকে এটি যেমন ভারতের সাথে সীমান্ত আলোচনায় নেপালকে কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেবে, অন্যদিকে বেইজিং ও লন্ডনের হস্তক্ষেপ কামনার বিষয়টি নয়াদিল্লিকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সদ্য নির্বাচিত এই সরকার জাতীয়তাবাদী আবেগের মুখে তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে হিমালয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলবে।