মরণজয়ী করসেবক থেকে শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায়, চার দশকের নাছোড় লড়াইয়ে শেষ হাসি দুধকুমারের

মরণজয়ী করসেবক থেকে শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায়, চার দশকের নাছোড় লড়াইয়ে শেষ হাসি দুধকুমারের

যখন পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অস্তিত্বই প্রায় স্পষ্ট ছিল না, তখন থেকেই দলটির ঝাণ্ডা ধরে রেখেছিলেন দুধকুমার মণ্ডল। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চমকপ্রদ জয় পান বিজেপির এই ‘আদি নেতা’। অবশেষে আজ শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেলেন বীরভূমের এই লড়াকু ব্যক্তিত্ব। একের পর এক হারের পরেও মাটি কামড়ে পড়ে থেকে কীভাবে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়, দুধকুমার মণ্ডল আজ তার এক অন্যতম দৃষ্টান্ত।

রক্তাক্ত অতীত ও অলৌকিক বেঁচে ফেরা

রাজনীতিতে দুধকুমার মণ্ডলের পথচলা শুরু হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রচারক হিসেবে। ১৯৯২ সালের অযোধ্যা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় ‘করসেবক’। ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যার বিতর্কিত কাঠামো ধ্বংসের সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তবে করসেবা শেষে ফেরার পথে তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বর্ধমান স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পর বামেদের শ্রমিক ইউনিয়নের অফিসের কর্মীরা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করে। আক্রমণকারীরা তাঁকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। জ্ঞান ফেরার পর অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচিয়ে কোনোক্রমে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। সেদিন কপালজোরে বেঁচে ফেরা এই নেতাই পরবর্তীতে বীরভূমে বিজেপির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

পরাজয়ের গ্লানি মুছে বীরভূমের সংগঠক

সঙ্ঘের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে ১৯৮৮ সালে ময়ূরেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বিজেপির টিকিটে প্রথমবার সদস্য নির্বাচিত হন দুধকুমার। তবে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের ময়দানে তাঁর পথচলা সহজ ছিল না। ২০১১ সালে ময়ূরেশ্বর আসন, ২০১৬ সালে রামপুরহাট এবং ২০১৯ সালে বীরভূম লোকসভা কেন্দ্র থেকে টানা পরাজয়ের সম্মুখীন হয়ে হারের হ্যাট্রিক করেন তিনি। তা সত্ত্বেও দলবদল না করে নিষ্ঠার সাথে সংগঠন ধরে রাখেন। ২০১৫ সালে বীরভূম জেলা সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলায় দলের ভিত শক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা নেন তিনি। শাসক দলের চোখে চোখ রেখে কথা বলা কিংবা অনুব্রত মণ্ডলের গড়ে পুলিশকে পাল্টা ধমক দিয়ে বারবার খবরের শিরোনামে এসেছেন এই প্রতাপশালী নেতা।

অভিমানী বিদ্রোহ ও মন্ত্রিসভায় মহাজয়

দলীয় রাজনীতির অন্দরে দুধকুমার মণ্ডলের পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। যোগ্য সম্মান না পেয়ে কখনো বিদ্রোহী হয়েছেন, কখনো আবার দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্দল হিসেবে দাঁড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ২০২১ সালে ক্ষোভের কারণে জেলা সভাপতির পদ ছাড়লেও দল ছাড়েননি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ময়ূরেশ্বর আসন থেকে বিজেপিকে এক বিরাট অঙ্কের জয় উপহার দেন তিনি। ‘যে সয় সে রয়’ নীতিতে বিশ্বাসী এই আদি নেতাকে তাই শুভেন্দু সরকারের মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণে ‘স্পেশ্যাল ৩৫’-এর অন্তর্ভুক্ত করে যোগ্য সম্মান দিল বিজেপি নেতৃত্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *