চাষের মাঠ থেকে সরাসরি লোকভবন, বাঁকুড়ার দিবাকরের রূপকথা কি হার মানাবে সিনেমাকেও!

চাষের মাঠ থেকে সরাসরি লোকভবন, বাঁকুড়ার দিবাকরের রূপকথা কি হার মানাবে সিনেমাকেও!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার মেগা সম্প্রসারণ সম্পন্ন হলো। রাজ্যপাল আরএন রবির হাত ধরে সোমবার লোক ভবনে নতুন ৩৫ জন মন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। তবে এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে যে নামটি রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মুখে সবচেয়ে বেশি চর্চিত হচ্ছে, তিনি হলেন বাঁকুড়ার সোনামুখী বিধানসভার টানা দু’বারের বিধায়ক দিবাকর ঘরামি। এক চরম দরিদ্র উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান থেকে নবান্নের অলিন্দে জায়গা করে নেওয়ার এই সফরটি যেন কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।

শিকড়ের লড়াই এবং রাজনৈতিক উত্থান

দিবাকর ঘরামির শিকড় মূলত ওপার বাংলায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তাঁর পরিবার বরিশালের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হয়। বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী ব্লকের দামোদর নদ সংলগ্ন কুরুমপুর নামের এক প্রত্যন্ত চরে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে তাঁদের। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া দিবাকর মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে এলাকায় বিজেপির তেমন কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও, এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে পদ্ম শিবিরের রাজনৈতিক জমি তৈরি করতে শুরু করেছিলেন তিনি।

তারই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সোনামুখী কেন্দ্র থেকে প্রথমবার টিকিট পেয়ে হেভিওয়েট তৃণমূল প্রার্থীকে প্রায় ১১ হাজার ভোটে পরাজিত করেন। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনেও দলের ভরসার মর্যাদা রেখে তৃণমূল প্রার্থীকে ২৯ হাজার ৪১০ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাস্ত করে নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেন এই ভূমিপুত্র। তবে বিধায়ক বা মন্ত্রী হওয়ার পরেও নিজের মাটির মানুষকে ভুলে যাননি তিনি; আজও প্রতিদিন ভোরে নিজের ফসলের খেতে কোদাল চালানো এবং চাষবাস করা তাঁর নিত্যদিনের রুটিন।

উত্থানের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

দিবাকর ঘরামির এই অভাবনীয় উত্থানের পেছনে রয়েছে তাঁর দলের প্রতি দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ আনুগত্য, চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মাটি কামড়ে পড়ে থাকার জেদ এবং একজন সাধারণ কৃষক হিসেবে বজায় রাখা পরিচ্ছন্ন ও সৎ ভাবমূর্তি। তৃণমূল স্তরের একজন লড়াকু কর্মীকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে বিজেপি মূলত রাজ্যের সাধারণ ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে চেয়েছে।

তাঁর এই মন্ত্রীত্ব লাভের ফলে বাঁকুড়া জেলাসহ সমগ্র জঙ্গলমহল এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরণের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একজন ভূমিপুত্র মন্ত্রিসভায় আসায় অবহেলিত সোনামুখীর সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দামোদর নদের চিরকালীন সমস্যা অর্থাৎ নদী ভাঙন রোধ এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাটের ভোলবদল করার ক্ষেত্রে এই নতুন মন্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সাথে, এই ঘটনাটি দলের তৃণমূল স্তরের সাধারণ কর্মীদের কাজের প্রতি আগ্রহ ও মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *