লতা-রফি-কিশোরের রূপকথার নেপথ্যে এক বাঙালি, ভারতীয় সিনেমা বদলে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক বিপ্লব

লতা-রফি-কিশোরের রূপকথার নেপথ্যে এক বাঙালি, ভারতীয় সিনেমা বদলে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক বিপ্লব

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি কিংবা কিশোর কুমার আজ কিংবদন্তির সমার্থক। তাঁদের কণ্ঠ ছাড়া বলিউডকে কল্পনা করাও আসাম্ভব। তবে এই মহাতারকাদের জন্মের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় ৯০ বছর আগের এক যুগান্তকারী ইতিহাস। একসময় সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ক্যামেরার সামনেই নিজেদের গান নিজেদের গাইতে হতো, পর্দায় প্লেব্যাক বা নেপথ্য কণ্ঠের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৩৫ সালে এক বাঙালি সংগীত পরিচালকের হাত ধরে জন্ম নেওয়া এক অভিনব প্রযুক্তি ভারতীয় চলচ্চিত্রের খোলনলচে বদলে দেয়।

লাইভ রেকর্ডিংয়ের জটিলতা ও অচলাবস্থা

১৯৩১ সালে ভারতের প্রথম সবাক ছবি ‘আলম আরা’ মুক্তির পর অভিনেতাদের শুটিং চলার সময় সরাসরি ক্যামেরার সামনে গান গাইতে হতো। ফলে অর্কেস্ট্রার শিল্পীদের ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে, সেটের আড়ালে কিংবা অদ্ভুত সব জায়গায় লুকিয়ে থাকতে হতো। এই প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, অভিনয়ের দক্ষতা থাকলেও শুধু ভালো গাইতে না পারার কারণে বহু প্রতিভাবান শিল্পী পর্দায় সুযোগ হারাতেন।

রাইচাঁদ বড়ালের হাত ধরে প্লেব্যাকের সূচনা

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটান বিখ্যাত বাঙালি সংগীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল। পরিচালক নীতিন বসু এবং রেকর্ডিস্ট মুকুল বসুর সঙ্গে মিলে তিনি এক বৈপ্লবিক পদ্ধতির জন্ম দেন। তাঁদের ভাবনা ছিল, আগে থেকেই স্টুডিয়োতে গান রেকর্ড করা হবে এবং শুটিংয়ের সময় অভিনেতারা সেই গানের সঙ্গে কেবল ঠোঁট মেলাবেন। ১৯৩৫ সালে নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ‘ধূপ ছাঁও’ ছবিতে প্রথমবার এই প্লেব্যাক প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করা হয়।

তারকা তৈরির নতুন সংজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

এই একটি আবিষ্কার ভারতীয় চলচ্চিত্রের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। অভিনেতারা লাইভ গান গাওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পাওয়ায় অভিনয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে, প্লেব্যাক প্রযুক্তির কল্যাণে কে. এল. সায়গল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে লতা, রফি ও কিশোর কুমারের মতো মহাতারকাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীরা শুধু গানকেই জনপ্রিয় করেননি, বরং বহু অভিনেতার পর্দার ব্যক্তিত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা আজ এক শতাব্দী পরেও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে টিকে রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *