ইন্দ্রনীল সেনের ‘সিন্ডিকেট রাজ’ ফাঁস! স্বজনপোষণ ও কাটমানির অভিযোগে বিস্ফোরক ঋদ্ধি ও দোলা

ইন্দ্রনীল সেনের ‘সিন্ডিকেট রাজ’ ফাঁস! স্বজনপোষণ ও কাটমানির অভিযোগে বিস্ফোরক ঋদ্ধি ও দোলা

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছাব্বিশের নির্বাচনে রাজ্যে শাসকদলের পতনের পর এবার টলিউড তথা বাংলার সঙ্গীত জগতের অন্দরে থাকা একাধিক দুর্নীতি ও ‘সিন্ডিকেট রাজ’ নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য সামনে এল। রাজ্যের প্রাক্তন পর্যটন মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা-গায়ক ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি করার মারাত্মক অভিযোগ তুললেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দোলা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের দাবি, বিগত জমানায় নির্দিষ্ট কয়েকজন ঘনিষ্ঠদের কাজ পাইয়ে দিয়ে সাধারণ যোগ্য শিল্পীদের বঞ্চিত করা হতো এবং কাজ দেওয়ার নামে রীতিমতো ‘কাটমানি’ বা তোলা আদায় করা হতো।

‘তোর ব্যাঙ্কে ৭ হাজার যাবে, ২ হাজার ব্যাক করিস’

সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ইন্দ্রনীল সেনের জমানায় সরকারি অনুষ্ঠান বা সঙ্গীত মেলায় পারফর্ম করার জন্য এক চরম নোংরা স্বজনপোষণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারি চলত। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “যদি কোনো অনুষ্ঠানে কোনো শিল্পী ৭ হাজার টাকা পেতেন, তবে তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হতো— ‘তোর ব্যাঙ্কে ৭ হাজার যাবে, কিন্তু ওখান থেকে ২ হাজার টাকা ক্যাশ ব্যাক করতে হবে প্রাক্তন মন্ত্রীকে’।” তাঁর অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোনো যোগ্যতা ছাড়াই অনেকে সরকারি অনুষ্ঠান পেতেন, এমনকি প্রভাব খাটিয়ে অনেকে স্থায়ী সরকারি চাকরিও বাগিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে, রবীন্দ্র সদনে ‘এ গ্রেড’ পাওয়া গায়ক উৎসব দাসও একই সুর চড়িয়ে জানিয়েছেন, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ইন্দ্রনীল সেনের ঘনিষ্ঠ ১০-১২ জনের বাইরে অন্য কাউকে সরকারি মঞ্চে ডাকাই হতো না।

১২ থেকে ১৮ বছর ধরে বয়কট বা ব্যানের শিকার

গায়িকা দোলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, মূলত সিনিয়র, জুনিয়র এবং মাঝবয়সী শিল্পীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘নেক্সাস’ বা চক্র তৈরি করেছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। যেখানে সরকারি আধিকারিকদের একাংশও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। শিল্পীদের একাংশের দাবি, ইন্দ্রনীল সেনের এই একনায়কতন্ত্র ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারাই মুখ খোলার বা সুর চড়ানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁদেরই ক্ষমতা খাটিয়ে ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সঙ্গীত জগত থেকে সম্পূর্ণ ‘ব্যান’ বা বয়কট করে রাখা হয়েছিল। গায়িকাদের দাবি, এই দুর্নীতির পাহাড় প্রমাণ তথ্য, ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট এবং বিলের কপি তাঁদের কাছে মজুত রয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে শিল্পীরা, সিবিআই তদন্তের দাবি

ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ওঠা এই বিপুল আর্থিক তছরুপ ও দুর্নীতি নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রফেশনাল পারফর্মিং সিঙ্গার্স’ (APPS)। জানা গিয়েছে, ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় ও দোলা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতা দরবার’-এ হাজির হয়ে প্রায় ১২ কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি বিশদ নথিপত্র বা ডসিয়ার জমা দিয়েছেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, ইন্দ্রনীল সেনের ভাইয়ের মালিকানাধীন তিনটি সংস্থাকে পাইয়ে দিতে রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমি, যাত্রা আকাদেমি ও ড্যান্স আকাদেমির সমস্ত টেন্ডার বা পরিকাঠামোর চুক্তি বেআইনিভাবে পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন এবং শিল্পীদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অভিযোগ ভিত্তিহীন ও লজ্জাজনক দাবি ইন্দ্রনীলের

সমস্ত অভিযোগ সামনে আসার পর অবশ্য নিজের সম্মানহানির প্রশ্ন তুলে পাল্টা সরব হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। তিনি এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তহীন’ এবং ‘লজ্জাজনক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইন্দ্রনীল সেনের দাবি, “প্রশাসনের কাছে যদি কোনো একটি প্রমাণ বা নথিপত্র থাকে যে আমি কারও কাছ থেকে মাত্র ৫টি টাকাও নিয়েছি, তবে প্রশাসন তা সামনে আনুক। দোষ প্রমাণিত হলে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি। বিগত বছরগুলিতে অন্তত ১৫ হাজার শিল্পী সরকারি মেলায় গান গেয়েছেন। এখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমার ও বিশিষ্ট শিল্পী শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে কাদা ছিটানো হচ্ছে।” রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর বিনোদন জগতের এই মহাবিস্ফোরণ যে টলিউডের অন্দরে বড়সড় ঝাঁকুনি দিতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *