উইয়ে কাটা টাকার পর এবার উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র, সুরেন্দ্রনাথ কলেজে দুর্নীতির হিমশৈল!

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সুরেন্দ্রনাথ কলেজ এখন খবরের শিরোনামে, তবে কোনো শিক্ষাগত সাফল্যের কারণে নয়, বরং একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত ঘটনায়। কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকে প্রথমে লাখ লাখ উইয়ে কাটা টাকা এবং বিলাসবহুল এসি বেডরুমের সন্ধান মেলার পর, এবার সেখান থেকে উদ্ধার হলো আগ্নেয়াস্ত্র। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটা এই ঘটনাগুলো শিক্ষাঙ্গনের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। ইউনিয়ন রুম থেকে উদ্ধার হওয়া বন্দুকটি কোথা থেকে এলো এবং এর পেছনে কাদের হাত রয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে মুচিপাড়া থানার পুলিশ।
রহস্যময় তালা এবং টাকার পাহাড়
গত ৪ তারিখ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই কলেজের একটি ইউনিয়ন রুমে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রহস্যজনকভাবে ঘরটির চাবি গায়েব হয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার পুরসভার সাফাই কর্মীরা এলে কলেজ কর্তৃপক্ষ তালা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। নোংরা ও আবর্জনায় ভরা ঘরটি খুলতেই কোণ থেকে দুটি স্যুটকেস উদ্ধার হয়, যার ভেতরে থরে থরে সাজানো ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ নগদ টাকা। দীর্ঘদিন বদ্ধ ঘরে থাকায় টাকার একটি বড় অংশই উইপোকায় কেটে নষ্ট করে দিয়েছে। প্রাথমিক অনুমান, চাবি গায়েব করে দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ টাকা লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছিল। নগদ টাকার পাশাপাশি ঘরটি থেকে বেশ কিছু ভাউচারও উদ্ধার হয়েছে, যা ব্যবহার করে বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধভাবে টাকা তোলা হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক নেতাদের প্রমোদকক্ষ
টাকা ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলেজের পাঁচ তলায় দুটি বিলাসবহুল শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শয়নকক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৬-৭ মাস আগে তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ছেলে শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ‘রিফ্রেশমেন্ট’ ও আরাম-আয়েশের জন্য এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছিল। আলমারি, দামি গদি, বালিশ ও কম্বল সমৃদ্ধ এই ঘরগুলোর চাবি থাকত ইউনিয়নের শাসকদলের নেতাদের কাছেই। এই ঘটনা প্রসঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির থেকে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, কলেজগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা লুট করা হয়েছে এবং নবীন বরণের নাম করে অ্যাকাউন্টে ফেলে রাখা বিপুল অর্থ আসলে দুর্নীতিরই অংশ।
কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই নজিরবিহীন ঘটনার পেছনে মূলত কলেজ ইউনিয়নের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির আড়ালে শিক্ষাঙ্গনকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আর্থিক তছরুপ এবং ব্যক্তিগত প্রমোদকন্দ্রে পরিণত করার কারণেই আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে কলেজের সাধারণ শিক্ষা পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ন হয়েছে, তেমনই সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মনে নিরাপত্তার অভাব ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘটনার গভীরতা বিবেচনায় পুলিশি তদন্তের পরিধি আরও বাড়তে পারে, যা আগামী দিনে কলেজের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের রদবদল ডেকে আনতে পারে।