গোটজের সেই রূপকথার পর নির্মম অধঃপতন, ২০২৬ বিশ্বকাপে কি ফিরবে জার্মানির হারানো গরিমা

গোটজের সেই রূপকথার পর নির্মম অধঃপতন, ২০২৬ বিশ্বকাপে কি ফিরবে জার্মানির হারানো গরিমা

২০১৪ সালের মারাকানা স্টেডিয়ামে মারিও গোটজের সেই ঐতিহাসিক অতিরিক্ত সময়ের গোল এবং চতুর্থবারের মতো জার্মানির বিশ্বজয় আজ কেবলই অতীত স্মৃতি। ম্যানুয়েল ন্যয়ার, টমাস মুলার, ফিলিপ লামদের সেই অপ্রতিরোধ্য দলটির সোনালী অধ্যায়ের পর বিশ্বফুটবল দেখেছিল এক নির্মম অধঃপতন। ২০১৮ এবং ২০২২—টানা দুটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল ইউরোপের এই ফুটবল পরাশক্তিকে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আচমকাই হারিয়ে ফেলেছিল নিজেদের চেনা ছন্দ ও ঐতিহ্য। এবার ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে সেই হারানো মর্যাদা ও গরিমা ফিরিয়ে আনার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের দল।

অভিজ্ঞতার প্রত্যাবর্তন ও তারুণ্যের নতুন জুগलबন্দি

বিপর্যয় কাটিয়ে এবারের জার্মান শিবিরকে সবচেয়ে বড় অক্সিজেন জোগাবে কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যয়ারের প্রত্যাবর্তন। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে তিনি আবারও জাতীয় দলে ফিরেছেন। অলিভার বাউমান কিংবা আলেকজান্ডার নুবেলের মতো ব্যাক-আপ কিপাররা থাকলেও, ন্যয়ারের উপস্থিতি রক্ষণভাগকে বাড়তি মানসিক শক্তি ও স্থিরতা প্রদান করবে।

তবে এবারের জার্মানির মূল শক্তি লুকিয়ে রয়েছে তাদের আক্রমণভাগে। চোট সারিয়ে দলে ফিরেছেন তারকা মিডফিল্ডার জামাল মুসিয়ালা। ক্লাব ফুটবলের সাম্প্রতিক ফর্ম যাই হোক না কেন, জাতীয় দলের জার্সিতে ফ্লোরিয়ান উইর্টজের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে চুরমার করার ক্ষমতা রাখে। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উইর্টজই হতে যাচ্ছেন এবারের জার্মান বাহিনীর প্রধান চালিকাশক্তি। এছাড়া বেঞ্চে লেনার্ট কার্ল, লেরয় সানে, জেমি লেওয়েলিং এবং ম্যাক্সিমিলিয়ান বেয়ারের মতো ফুটবলাররা থাকায় কোচের হাতে বিকল্পের কোনো অভাব নেই।

নাগেলসমানের রণকৌশল ও সাফল্যের সম্ভাবনা

সাবেক কোচ জোয়াকিম লোর জমানায় জার্মানির মূল ভিত্তি ছিল অভিজ্ঞতা, কিন্তু বর্তমান কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান হেঁটেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। তিনি অভিজ্ঞতার চেয়ে তরুণ প্রতিভার ওপর অনেক বেশি ভরসা রাখছেন। কাগজে-কলমে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড বা পর্তুগালের মতো দলগুলির তুলনায় জার্মানি দলে বিশ্বমানের মহাতারকার সংখ্যা হয়তো কম, কিন্তু ফুটবল ইতিহাস বলছে, জার্মানির আসল শক্তি একক প্রতিভায় নয়, বরং দলগত সংহতিতে।

২০২৪ সালের ইউরো কাপে জার্মানির পারফরম্যান্স ছিল নাগেলসমানের রণকৌশল সফল হওয়ার বড় প্রমাণ। সেমিফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত রেফারিংয়ের শিকার না হলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। বর্তমান ছক অনুযায়ী গোলপোস্টে ন্যয়ারের সামনে রক্ষণে থাকছেন জশুয়া কিমিখ, জোনাথন তাহ, নিকো শ্লটারবেক এবং ডেভিড রাউম। মাঝমাঠ সামলানোর দায়িত্বে আলেকজান্ডার পাভলোভিচ ও ফেলিক্স এনমেচা। আক্রমণভাগে লেনার্ট কার্ল, মুসিয়ালা এবং উইর্টজের পিছনে একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে খেলবেন ডেনিজ উনদাভ। প্রয়োজনে কাই হাভার্ৎজ ও নিক ভল্টেমাডেকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ বুঝে কৌশল বদলাতে পারেন কোচ।

বিগত এক দশকের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কালো মেঘ কাটিয়ে ওঠা জার্মানির জন্য নিঃসন্দেহে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে ন্যয়ারের পাহাড়সম অভিজ্ঞতা, উইর্টজ-মুসিয়ালার আক্রমণাত্মক সৃজনশীলতা এবং নাগেলসমানের আধুনিক ফুটবল দর্শনের সঠিক মেলবন্ধন ঘটলে, চলতি বিশ্বকাপে জার্মানি আবারও বিশ্বজয়ের প্রবল দাবিদার হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *