বিদ্রোহের ‘মূল্য’ চুকিয়েই কি পদ পেলেন শিউলি? তৃণমূলে নতুন সমীকরণ ঘিরে জল্পনা

বিদ্রোহের ‘মূল্য’ চুকিয়েই কি পদ পেলেন শিউলি? তৃণমূলে নতুন সমীকরণ ঘিরে জল্পনা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এক বেনজির ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী থাকল রাজ্য রাজনীতি। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অন্ধকারে রেখে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে স্পিকারের কাছে অফিশিয়াল চিঠি পেশ করল বিক্ষুব্ধ অংশ, যারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। তবে এই নতুন পরিষদীয় দল গঠনের শুরুতেই পদ ও ক্ষমতা নিয়ে তীব্র আকচাআকচি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে চলে এসেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, নবনির্বাচিত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামলাতে এক জন নয়, চার-চার জন ডেপুটি লিডার বা উপনেতা নিয়োগ করতে হয়েছে।

বিধানসভার অলিন্দে এই নাটকীয় পর্বের মূল হোতা উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সহযোগী এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করার পর অন্যান্য পদ নিয়ে কোন্দল শুরু হয়। প্রথম দফায় মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানকে মুখ্য সচেতক এবং প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন ও সন্দীপন সাহাকে ডেপুটি লিডার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই তালিকা আসতেই তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা। সরাসরি হাত তুলে নিজের ‘বিদ্রোহের মূল্য’ দাবি করে তিনি ডেপুটি লিডার পদের জন্য সোচ্চার হন। দলে নতুন করে বিভেদ এড়াতে তড়িঘড়ি শিউলি সাহাকেও চতুর্থ ডেপুটি লিডার হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হন ঋতব্রত। নয়না বা অসীমাদের সরিয়ে এই চার ডেপুটি লিডারের অন্তর্ভুক্তি পরিষদীয় দলের ভেতরকার চরম অস্থিরতাকেই স্পষ্ট করছে।

তৃণমূলের ভাঙনে সুচতুর রাজনৈতিক কৌশল

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন এই কমিটির বিন্যাসে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ‘সংখ্যালঘু কার্ড’ ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন কমিটির শীর্ষপদে আনা হয়েছে তিন সংখ্যালঘু মুখ— আখরুজ্জামান, জাভেদ খান এবং সাবিনা ইয়াসমিনকে। এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে জেতা ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৩২ জনই সংখ্যালঘু এবং বাকি আসনগুলোতেও এই ভোটব্যাঙ্কের বড় ভূমিকা ছিল। মূলত এই বড় অংশের সমর্থন ধরে রাখতেই এই রণকৌশল নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, নিজেদের রাজনৈতিক দুর্বলতা ঢাকতে এবং জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে পোস্টার ও ব্যানারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই বিক্ষুব্ধ শিবির। তারা ভালো করেই জানে, এবারের নির্বাচনে সাফল্য এসেছে মূলত মমতার মুখকে কেন্দ্র করেই।

সম্ভাব্য প্রভাব ও কালীঘাটের পাল্টা তোপ

এই বিদ্রোহ ও নতুন সমীকরণের ফলে রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি হতে চলেছে। তবে এই নতুন সমীকরণকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে নারাজ কালীঘাট শিবির। তাদের সরাসরি অভিযোগ, বিজেপির মদতেই ঋতব্রত এবং সন্দীপন সাহা এই ভাঙনের খেলা খেলছেন। রাজনৈতিক মহলেও এই নতুন কমিটির স্থায়িত্ব নিয়ে বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছে। এতকাল ধরে আখরুজ্জামান বা জাভেদ খানরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোয় আলোকিত ছিলেন। ফলে, দলনেত্রীকে বাদ দিয়ে তৈরি হওয়া এই নতুন গোষ্ঠীকে রাজ্যের সাধারণ সংখ্যালঘু সমাজ কতটা নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন, ক্ষমতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক দুর্বলতা সঙ্গে নিয়েই বিধানসভায় নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছে এই নতুন শিবির।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *